This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

6 May 2016

অর্ঘ্য দত্ত




অর্ঘ্য দত্তকে দেয়া বারীন ঘোষালের সাক্ষাতকার ___ ‘মায়াজম’-এর জন্য... ১৯/৪/২০১৬। দিল্লী।
১।। অর্ঘ্য :- বারীনদা,মনে আছে নিশ্চয়ই মাসখানেক আগেই দিল্লিতে বহির্বঙ্গের কবিদের একটি আলোচনাসভায় আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা তৈরি হওয়াতে আমি ফোন করে আপনার সঙ্গে আড্ডা মারার আবদার করেছিলাম। আসলে আপনার মুখ থেকে আপনার কবিতা ভাবনা নিয়ে দু-চার কথা শোনার লোভটাই ছিল মূল কারণ। দিল্লির সেই অনুষ্ঠানে আপনি উপস্থিত না থাকাতে সে সুযোগ আর হয় নি। বছর দুয়েক আগেও আপনার নামই না শোনা, আপনার লেখা পড়া তো দূরের কথা, এই আমি, মূলধারার পত্রিকা পড়েই যার কবিতা চেনা ও ভালোবাসা , বহির্বঙ্গের সেই মুখ হাঁ করা পাঠকটির যখন এখানে একটা সুযোগ মিললোই তখন আপনার সঙ্গে বাকি থাকা সেই ইনফর্মাল আড্ডাটাই বরং হোক। তাছাড়া, আপনার লেখালিখির সঙ্গে দীর্ঘ পরিচিত কোনো প্রাজ্ঞ আলোচকের মতো করে ফর্মাল সাক্ষাতকার নেওয়া আামার পক্ষে সম্ভবও নয়।
যেটুকু পড়েছি তাতে আপনার নাম বললেই যে দুটি কথা প্রথমেই মনে আসে তা হল 'নতুন কবিতা' এবং 'অতিচেতনার কথা'। এই বিষয়দুটি নিয়ে যদি আপনি কিছু বলেন -- বিশেষ করে লিটল্ ম্যাগাজিন না হাতে পাওয়া আমার মতো অজস্র বাঙালি পাঠকদের কথা মনে রেখে।
বারীনদা :- মাত্র দেড় বছর আগে তোমার সাথে আলাপ ফেসবুকে। তুমি বহির্বঙ্গ কবিতা সংকলনের জন্য কারো পরামর্শে আমার কবিতা চাইলে। সেই প্রথম তোমাকে জানলাম। পরে বইমেলায় সাক্ষাৎ। এবার দিল্লী বইমেলায় আমার সঙ্গে আড্ডা মারার জন্য তোমার আগ্রহ আমাকে বিস্মিত করেছে। আমার আসা হল না। তারপরই সাক্ষাতকারের এই প্রস্তাবে পুলকিত হলাম আবার। আমি যে বাংলা কবিতার ভিলেন, টের পেলে আবার পিছিয়ে যাবে না তো ? তোমার মূল প্রশ্ন দুটি নিরসন করি আগে।
“অতিচেতনার কথা” --- “কৌরব”-এর আমরা সবাই সত্তর দশকে প্রতি সপ্তাহে কবিতার আড্ডায় বসতাম কারো না কারো বাড়িতে, প্রায়ই স্বদেশ সেনের বাড়িতে। কবিতা পাঠ ছাড়াও আলোচনা হত কবিদের নিয়ে এবং হাল আমলের পত্রিকায় লেখালিখি নিয়ে। ক্রমশ আমরা বিরক্ত হচ্ছিলাম আমাদের গতানুগতিক কবিতার ছিরিতে। চারপাশে চেয়ে দেখলাম আবহমান বাংলা কবিতায় সবাই প্রভাবিত ও প্রবাহিত। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে হালের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার --- এভাবে নতুনতর প্রভাবের অভাবে বাংলা কবিতায় রিমেক রিমিক্স আর নকল ও প্লাগিয়ারিজম চলছে। আমরাও তাই করে চলেছি। বোর হয়ে ঠিক করলাম হয় মৌলিক কবিতা লিখব যা কেউ কোনদিন লেখেনি নয়তো কবিতা লেখা ছেড়ে দেবো। এর চেয়ে বাজারে বসা বা বাগান করা অনেক ভাল কাজ। কিন্তু চাইলেই তো আর মৌলিক কবিতা আসবে না কলমে। স্বপ্নেও আসবে না। কবিতার ইতিহাসের পরম্পরায় যে মূলধারা বা মেইন স্ট্রিম কবিতা তার যে কোন শাখাধারা বা উপধারা তৈরি হতে পারে কিন্তু বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয় মনে হয়েছিল। কিন্তু মৌলিক কবিতার জন্য তো চাই একটা নতুন পরিসর। ভিন্ন নির্মাণ পন্থা এবং সেই সঙ্গে পাঠক তৈরি করা। খুব চিন্তায় ছিলাম।
অবশেষে আমরা সবাই মাসে একবার পরিবার অফিস সংসারের নিত্যদিন ছেড়ে বই খাতা রেশন ব্যাগ নিয়ে পাড়ি দিতাম দূরে কোথাও, পাহাড়ে জঙ্গলে নদীতিরে সমুদ্র-প্রান্তে। তিনদিনের কবিতার ক্যাম্পে চলে যেতাম। সেখানে রাতদিন পড়া শোনা তর্ক বিতর্ক কবিতার ইতিহাস, বিশ্বকবিতার পরিপ্রেক্ষিত, বাঙালি তরুণ কবির পোটেন্সিয়াল সব মদ্য সহযোগে আলোচিত হত এবং মূলধারা থেকে বাইরে বেরোবার উপায় অন্বেষণ করা হতো। সেই সময় ষাট দশকের আমেরিকান কবি নিকোনার পায়রার প্রতি-কবিতা আকর্ষণ করেছিল আমাদের। ১৯৮২তেই স্বদেশ সেন লিখলেন তার যুগান্তকারী কবিতার বই ‘রাখা হয়েছে কমলালেবু, কমল চক্রবর্তী লিখলো ‘মিথ্যে কথা’। ১৯৮৪তে আমি লিখলাম ‘মায়াবী সীমূম’ --- কবিতার বইগুলো। ১৯৮৭তে শঙ্কর লাহিড়ী লিখেছিল ‘মুখার্জি কুসুম’। বইগুলো ব্যতিক্রমী এবং খুব আদৃত হয়েছিল। সবাই মনে করলাম মৌলিক কবিতা পেয়ে গেছি এবং তৈরি পাঠকও উপস্থিত। নতুনতর খোঁজ থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমি তা মনে করলাম না। ভাবনা চলতে থাকল। কবিতার ক্যাম্প চলেছিল ১৯৮৯ পর্যন্ত রেগুলার। ১৯৮৮তে একবার ক্যাম্পে কমল চক্রবর্তী ‘চেতন-কল্প’ শব্দটি প্রয়োগ করেন চেতনার মধ্যে কল্পনার প্রয়োগ বোঝাতে, যা ঠিক চেতনা নয়, চেতনার কল্পনা। কিন্তু আমি পড়লাম আতান্তরে। ‘চেতনা’ শব্দটা আমাতে জেঁকে বসল। সুররিয়ালদের স্মরণ করলাম। অবচেতনার কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দ দাশ যা পরবর্তী কয়েক দশকের কবিদের প্রভাবাচ্ছন্ন রেখেছিল। আমি চেতনা-অবচেতনার পাকে পড়ে কেন্দ্রাভিগ চেতনার বদলে কেন্দ্রাতিগ চেতনা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। যাই ভাবি না কেন তা অন্তর্মুখী না হয়ে বহির্মুখী হোক। ভাবনা জড়তা কাটিয়ে নিঃসারিত হোক বৃহতে। শব্দ যেভাবে ছড়িয়ে পরে, বাতাস, আলো, বিদ্যুৎ, সেভাবে চিন্তা ছড়িয়ে পড়ুক, চেতনা বিকশিত হোক। আর সেভাবে অক্ষর শব্দ বাক্য বিশ্বাস সিদ্ধান্ত সব ছড়িয়ে পড়ুক, সব সব। এই বিশ্বে অতিচেতনা দিয়ে খুঁজি আমার কবিতা। জল বাতাস আলো বিদ্যুৎ চেতনা হাই পোটেন্সিয়াল থেকে লো পোটেন্সিয়ালের দিকে এগোয়, ছড়িয়ে পড়ে। আমার কবিতা ভাবনাও তেমনি আলো থেকে অন্ধকারের দিকে এগোবে, কোয়ার্কের দিকে, এই বিশ্বসংসারে ৯৯%-ই তো অন্ধকার, আমার চেতনার স্পর্শ সেই সব অন্ধকারকে উজ্জ্বল করুক। এটাই আমার ‘অতিচেতনার কথা’। আমাদের শরীরে আবর্তিত হয় বিদ্যুৎ এবং তাই আমরা বেঁচে থাকি। ইলেক্ট্রিক কারেন্টে করোনা তৈরি হয় যা বলয়াকারে ছড়িয়ে পরে। যখন আমার অতিকেন্দ্রিক চেতনার ভাবনা সেই করোনাকে স্পর্শ করে, ভাবনাটা নিমেষে উজ্জ্বল হয়। এটাকেই বলেছি অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়া। সেই ভাবনা অপার্থিব কবিতার আভাস দেয়। কবিতা গড়ে উঠতে চায়। কালি কলম আর সময়ের প্রশ্রয়ে কবিতা প্রকাশিত হয় যা ভিন্ন ভাষার, নতুন নির্মাণ। এই আমার অতিচেতনার কবিতা। ১৯৮৯ সালে লিখি আমার প্রথম অতিচেতনার কবিতা “সৎকার” যেটি দীর্ঘ এবং ঐ নামের একটা বইও ছিল। ‘অতিচেতনা’ শব্দটা ক্যাজুয়ালি অনেকে ব্যবহার করেছেন, যেমন বিনয় মজুমদারের একটা সাক্ষাতকারেই আছে, কিন্ত কেউ তার বিস্তার বা প্রয়োগ করেননি।
“নতুন কবিতা” --- ১৯৯০ সালে কলকাতার কবি অভী সেনগুপ্তের বিশেষ আগ্রহে এপ্রিল মাসে কৌরবের শেষ কবিতার ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয় এক নদীতিরে। সেখানে তারই উৎসাহে ধীমান চক্রবর্তী ক্যাম্পে যোগ দেয়। আমাদের পাঠ আর আলোচনায় ধীমান বিশেষ আগ্রহ দেখায় ও প্রীত হয়। সেসময় ধীমান চক্রবর্তী তার বন্ধুবান্ধব সহ একযোগে মূলধারা কবিতা থেকে নিষ্ক্রমণের পথ খুঁজছিল। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব পত্রিকা থাকা সত্ত্বেও ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ নামে একটা গ্রুপ তৈরি করে পথ খুঁজছিল। আমাদের সাথে তাদের পরিচয় ছিল না, বা তারা কৌরবের কবিতার ক্যাম্পের কথাও জানতোনা। এবার ১৯৯১-এ ১ নং কবিতা ক্যাম্পাস পত্রিকা নিয়ে জানুয়ারি মাসে আমার বাড়ি এসে আর ফিরে যেতে পারেনি সংস্রব ছেড়ে। আমরা আবার শুরু করি কবিতার ওয়ার্কশপ। তাদের নিজস্ব পত্রিকা তুলে দিয়ে কবিতা ক্যাম্পাস চালাতে থাকে আর ওয়ার্কশপের কথা এবং গদ্য, কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে নব্বই দশকে। খুবই নাড়াচাড়া পড়ে যায় তরুণ কবিদের মধ্যে।
আমরা সবাই প্রথমে অতিচেতনার কথাটা বুঝি দিনের পর দিন ওয়ার্কশপে। আট বছর ধরে জামশেদপুরে আমার বাড়িতে, রাসবিহারী, শালকিয়া, খড়গপুর, টিপু সুলতান রোড ... এসব জায়গায় আমাদের বাড়িতেই চলতে থাকল আড্ডা অতিচেতনার ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সমস্যা নিয়ে। তার জন্য আমাদের ভাষাকেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা দরকার আমরা মেনে নিলাম। আমরা ভাষার উৎস ধ্বনির কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম আমাদের মৌলিক কবিতার বাহক ভাষার স্বরূপ কী হবে। অনেক বাদ প্রতিবাদ-এর মধ্য দিয়ে আমরা আবিষ্কার করেছিলাম আমাদের নবচেতনা প্রকাশের জন্য প্রচলিত ভাষাকে লিপ ফরোয়ার্ড করাতে হবে। এভাবে স্বপন রায়, প্রণব পাল, রঞ্জন মৈত্র, ধীমান চক্রবর্তী, অলোক বিশ্বাস ইত্যাদিরা এবং আমি যে কবিতা লিখছিলাম ১৯৯৩ সালে তাকেই বলেছিলাম ‘নতুন কবিতা’। ঐ নামে ২০০১ সালে শুরু হয় নতুন কবিতা নামের পত্রিকা। ভাষাকে প্রত্যেকে নিজের ভাবনা মতো পালটেছে, পরীক্ষা করেছে পাঠকের প্রতিক্রিয়া, গদ্যের মাধ্যমে আগ্রহী করেছে পাঠককে, কিন্তু সবাই লিখেছে নিজের কবিতা। নতুন কবিতার কোন মডেল নেই। ক্রমশ তরুণরাও লিখতে শুরু করল। মূল কথা হল আবহমান বাংলা কবিতার মূলধারার কবিতা বাদে বাকি সব কবিতাই নতুন কবিতা। মূলধারা কবিতার চিহ্ন ও গুণ সম্পূর্ণ বাদ দেয়া হয়েছিল। দেখা গেল কবিতার পৃথক পরিসর তৈরি করে দিলে কবিরা নিজেদের মনোমত কবিতা নির্মাণ করতে পারবে সেখানে। বাংলা কবিতা জগতে মাঝে মাঝেই ব্যতিক্রমী কবিরা এসেছিলেন। তাদের নিয়ে আমরা আলোচনা করে বুঝতে চেয়েছিলাম কেন তারা প্ররোচনায় সফল হননি।
২।।অর্ঘ্য :- আপনি বলেছেন__ 'খোঁজ করার দার্শনিক পদ্ধতির বদলে আমাদের ছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আপনি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। এই আপনাদের বৃত্তের অনেকেই তাই। আর্যনীলকেও কোথাও বলতে শুনেছি__ 'একজন ইঞ্জিনীয়র হিসেবে নতুন উৎপাদনে বিশ্বাস করতে যে স্বপ্ন, সাহস ও সদিচ্ছা লাগে, সেই একই প্রবণতা ও গুণ পরীক্ষা কবিতার কাছে নিয়ে যায়।' আচ্ছা, কবিতা লেখার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সম্পর্ক কি পুরুষের ভালো প্রমিক হওয়ার সঙ্গে গায়নোকোলজিস্ট হওয়ার সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূ্ণ?
বারীনদা :- জানা জিনিষ বা ব্যক্তিকেও খুঁজতে হয়। অজানা অজ্ঞাত আভাসকেও খুঁজতে হয়। এই খোঁজের বিশেষ পন্থাকে বলে বিজ্ঞান। আপেলটা বা কম্পুটার বিজ্ঞান নয়। দর্শনে আমরা ওই আপেল, কম্পুটার, মানুষের কাজ, ভাবনা, চরিত্র, ব্যবহার, সমাজ সম্পর্ক দেখে বা ভেবে বুঝতে পারি। মানুষের কর্তৃত্বের লোভ, রিপু, ঈশ্বর চেতনার লাভ, সবই দর্শনের আওতায় পড়ে। অকস্মাৎ আভাস থেকে তার উৎস খোঁজাটা বৈজ্ঞানিক। তার জন্য বিজ্ঞাবের ছাত্র হবার প্রয়োজন হয় না। রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। কবিতাকে লেখা যায় না। কবিতা কবির চেতনাতেই থেকে যায়। কারণ শব্দের মানে হয় না। নেই। অভিধানে উঠে আসার আগে তা মানুষ বহুরূপে ভেবেছিল এবং অভিধানে শব্দের সেই বহুরূপ থাকে। সেগুলো অর্থ নয়। তাই শব্দে লিখিত কবিতারও কোন অর্থ হয় না। এই ধরো ‘ভালো প্রেমিক’ কাকে বলে বোঝাতে তুমি একশটা শব্দ বলবে কারণ সেটা বিশেষণ। আর ‘গাইনোকোলজিস্ট’ বোঝাতে হয় না কারণ ওটা একটা সংজ্ঞা, বিশেষ্য। ফলে তুলনা হয় না।
তুমি নিশ্চয়ই অনেককে দেখেছো শিশুদের খেলা ভালবাসতে, গাছপালা, পাহাড় জঙ্গলে, নদী সমুদ্রের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে, বারে বারে সেই সব জায়গায় বেড়াতে যেতে, অভুক্ত রাস্তার মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে, কোন মা তার সন্তানের গমন পথে চেয়ে আছে দেখছে মানুষ, তার ভাল লাগছে। গান শুনছে সে, অশ্রুত নতুন গান বা পুরনো সিনেমার গান গাইছে নিজে গায়ক না হয়েও --- এরা সবাই কবি। তারা চোখে কানে যে আন্দাজটা পাচ্ছে তাই কবিতা। সে লিখতে জানে না। এদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন শব্দ সাজিয়ে কবিতা প্রতিমা বানাতে পারে, রবীন্দ্রনাথই কথাটা বলেছিলেন, সেই কাব্যপ্রতিমাতে আমাদের আস্থা নেই। ফলে আমরা কবিতালিপি তৈরি করি। যেমন সঙ্গীতের জন্য স্বরলিপি রচনা করা হয়। কবিতালিপি থেকে পাঠকের মনে কবিতা ট্রিগার করার ব্যবস্থা রাখা হয়। সেই উচ্চারণ থেকে পাঠকের মনে এক অন্য কবিতার বোধ উদ্ভুত হয়। কবিতাটি পাঠকের ভাল লাগে। এই সব যোগাযোগগুলির খোঁজ করা, পাঠকের মনে তার প্রভাব পরীক্ষা নিরীক্ষার খোঁজ করার পন্থাটি বিজ্ঞান। সবাই কবির মতো সবাই পাঠক। কিন্তু কবিদের মতোই পাঠকের শ্রেণীবিভাগ আছে, বিশেষ কবির প্রতি পক্ষপাক্ষিকতা আছে। ফলে কবিদের আর পাঠকদের সাধারণীকরণ সম্ভব না। কিন্তু সব কবিরই আছে কিছু দীক্ষিত পাঠক। কবির মতো পাঠকেরও খোঁজ আছে। আছে হঠাৎ মিলন। আশা করি ‘খোঁজ’-এর নিরসন হয়েছে এতক্ষণে।
৩।। আপনি বলেছেন__'সব শিল্পের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিল্প হল কবিতা। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তও।এবং এই আক্রমন মূলত অভিমানী পাঠকের, কখনো বা পরাক্রান্ত শাসকের। আপনার কি মনে হয় না এই আক্রমন বরং বেশি এসেছে কবিদের কাছ থেকেই? বাংলা কবিতা নিয়ে গত ছ'সাত দশকে যত পরীক্ষা হয়েছে,অন্তত আমাদের দেশে অন্য কোনো শিল্পের ক্ষেত্রে তা হয় নি, ।
বারীনদা :- আমার বলা –“সব শিল্পের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিল্প হল কবিতা” --- বুঝতে হবে এই আলোতে। কবিতা শিল্প নয়। কবিতা একটি শিল্পিত উপস্থাপনা। কবিতা লেখার প্রসেসটার মধ্যে শিল্প থাকে। যেমন মোনালিসা নিজে শিল্প নয়। তা একটা শিল্পকর্ম। কবিতালিপি তৈরি করাটা শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। কারণ তার নমুনা বা উদাহরণ নেই। মুর্তি গড়ার মতো শ’য়ে শ’য়ে বানাতে হয় না। একটি কবিতালিপি যে কোন পাঠকের ভাবনায় একটিই কবিতার জন্ম দেয়। বিভিন্ন পাঠকের মধ্যে বিভিন্ন কবিতার উদ্ভব হয়। বিচিত্র, না ? সমস্ত গঠন শিল্পের স্কুল আছে, আছে নির্দিষ্ট পাঠক্রম। কেবল কবিতারই নেই। নীরেন্দ্রনাথ লিখলেন ‘কবিতার ক্লাস’। তাঁকে নিয়ে ‘কবিতা পাক্ষিক’এর প্রভাত চৌধুরি নিজের গ্রামের লাইব্রেরিতে স্কুল চালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন। আসলে সেই স্কুল হচ্ছে খোঁজের ক্রমান্বয়, যেটা বিজ্ঞান। তা কোন স্কুলে শেখানো হয় না। মূলধারা কবিতা অনুসরণ না করে আমি ও আমরা নতুন একটা পরিসর তৈরি করেছি কবিতার যেখানের উৎপাদন অর্থাৎ কবিতাকে অপরিচিত মনে হবে। ভাষাকে অচেনা মনে হবে। তরুণরা নতুন রোমাঞ্চে, উৎসাহে নতুন কবিতা লেখা শুরু করলে “গেল গেল” রব উঠেছিল। মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত কবিরা, অদীক্ষিত কবিরা আমাদের আক্রমণ করেছিল বইকি শব্দ দিয়ে। সে সব মিডিয়া পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছিল। নতুন যুগকে মিসলিড করার জন্য তারা ভাবেন এবং আমি বলি --- আমি কবিতার ভিলেন। কবিতার ধারণাটাই আমার কাছে ভিন্ন।
৪।। আপনি কবিতা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছেন-- 'কবিতা কবির চেতনাতেই থেকে যায়' বা 'সেই ভাবনা অপার্থিব কবিতার আভাস দেয়'৷ এই অপার্থিব কবিতা আপনার বলা কবিতালিপির মাধ্যমে কীভাবে পাঠকদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে? গানের স্বরলিপি গায়কদের জন্য, তা শ্রোতাদের কোনো কাজে লাগে না, তারা স্বরলিপি থেকে সুর উদ্ধার করতে পারে না। । নতুন কবিতার পাঠকদের কাছ থেকে আপনি কী আশা করেন? তারা কবিতালিপির সংকেত উদ্ধার করে ঐ অপার্থিব কবিতাটিকে ছুঁতে পারবে? স্বরলিপির সংকেততো নির্দিষ্ট সুর চিহ্নিত করে, কবিতালিপি-র সঙ্গে তার তুলনা চলে?
বারীনদা :- স্বরলিপি থেকে গায়ক বা বাজিয়েরা সুর ও ব্যঞ্জনা টের পায়। সাধারণ শ্রোতারা নয়। বাকিরা শোনে শুধু। অসাধারণ শ্রোতারা বা অন্য গায়করা মুর্ছনা ধরতে পারলে তাদের শরীর জাগে। সাধারণ শ্রোতাদের তা হয়না। যারা পারে তারা শিল্পী। তেমনি কবিতালিপি থেকে দীক্ষিত পাঠক তার নিজস্ব কবিতার আভাস পায়, মনে মনে সেটা গড়ে উঠতে থাকে ভিন্ন শব্দে ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভাষায়, সন্তুষ্ট সে একটি ভিন্ন কবিতালিপি রচনা করে। নতুন ভাবে প্রকাশিত হয়। এটাই কবিতার প্ররোচনা নতুন কবিতার কবির প্রতি। কবি গ্রহণও করে পুলকিত হয়, লেখে নতুন কবিতা। স্বরলিপির স্বর কোন নির্দিষ্ট সুর নয়, তা সুরের প্রস্তাবনা করে এবং গ্রহীতাকে নিজের মতো করে বিস্তার করার সুযোগ দেয়। কবিতাও তাই। আমি আগেই বলেছি কবিতা নানা রকমের হয়, পাঠকও নানা বর্গের হয়। তুমি জেনারালাইজেশন করছো। আমি মূলধারা কবিতার বাইরের কথা বলছি। কবিরও যেমন সেই খোঁজ আছে, পাঠকেরও আছে। কবি ও পাঠকের মিল হয়ে যায় সেখানে।
কবিতা সর্বদাই অপার্থিব। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সাধারণত কথা, গল্প, রূপক, প্রতীক, উপমা, উপদেশ, দর্শন, বিপ্লব, রাজনীতি, সংসার, বাজার নিয়ে ব্যাখ্যা বা সারাংশ-সম্ভব কবিতা যা তুমি অহরহ চারপাশে লিখিত পঠিত উচ্চারিত হতে দেখো, সেসব সাধারণের বিশ্বাসের কবিতা। অথচ তার মধ্যে আমার কবিতা নেই। কবিতা আছে কবির অনুভবে এবং সেখানেই থেকে যায়, এমনকি লিখিত হবার পরেও।
৫।। '..সেই কবিতালিপি থেকে আপনি আপনারই একটা কবিতা পেলেন'... তার মানে আপনার কবিতালিপি পাঠকটিকে তার নিজের কবিতা পেতে সাহায্য করলো। ব্যাস? পাঠকতো তার নিজের কবিতা পেতে পারে একটি পাহাড় দেখে, সমুদ্র দেখে বা একটি নীরস গদ্য পড়েও, তাহলে নতুনকবিতা নতুন কী করলো? পাঠকের কবিতা পাওয়ার পথটি না হয় নতুন হল, কিন্তু সে যা পেলো তাও কি নতুন কিছু?
আজকের কিছু তরুন কবিকে, যারা হয়তো নতুন কবিতা লিখছে না, আবার মূলধারার মতোও লেখে না, আমি তাদের প্রিয় এমন পাঁচজন কবির নাম জানাতে বলেছিলাম যাদের কবিতা ওরা এখনো অবসর পেলেই পড়তে ভালোবাসেন। সেই সাতজনের একজন শুধু অর্জুন বন্দোপাধ্যায়ের নাম করেছিলেন, একজন মলয় রায়চৌধুরীর।বাদবাকি সেই জীবনানন্দ, শক্তি, ভাস্কর চক্রবর্তী, উৎপল কুমার বোস, মনীন্দ্র গুপ্ত....এঁরাই কমন ছিলেন প্রায় প্রত্যেকের তালিকায়। আরো বেশি করে নতুন কবিদের নাম আসছে না কেন?
বারীনদা :- আমি তো আগেই বলেছি কারা কবি। কারা পাঠক তা বলিনি কিন্তু। সেই কবিদের মধ্যেই কেউ কেউ পাঠক। এ ছাড়া পাঠকের অস্তিত্ব নেই। কবিদের মধ্যে কেউ কেউ লিখতে পারে কারণ সে জানে কবিতা লেখার শিল্প। সবাই জানে না। নতুন কবিতায় আমরা বলি সব কবিতাই অপার্থিব। তা বোধ করা যায়। কখনো দেখে, কখনো পড়ে বা শুনে। সব কবির ভাবনায় থাকে সেই অপার্থিব কবিতার আভাস। জনতার মধ্যে যারা পাঠক তারা আমার মতো ভাবে না। তুমি যাদের ওপর সমীক্ষা করেছো তারা কেউ নতুন কবিতার অস্তিত্ব জানে না বা স্বীকার করে না। তারা বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় মিডিয়া আশ্রিত প্রচারিত কবিদের নামই জানবে, যাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করে থাকে। এ তো স্বাভাবিক। ব্যতিক্রমী লেখককে প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। আমরাও প্রতিষ্ঠানকে পছন্দ করিনা। মলয় রায়চৌধুরিকে পুলিশ ধরে কেস করেছিল জানো তো ? কেন, জানো ? অর্জুন ছোটবেলা থেকেই আমার প্রিয় লেখক, সে ব্যতিক্রমী বলেই।
৬।। 'ক্লাস টু-এর ছেলে অংক লিখে ডাঃ রজার পেনরোজকে বলে, মশাই সহজ করে বলুন, নাহলে আপনি অংক জানেন না।'__ আপনিই বলেছেন পঠকদের করা দুর্বোধ্যতার অভিযোগ প্রসঙ্গে। ঠিক কথা। পাঠককেও শিক্ষিত হতে হবে। কিন্তু একজন উঁচু ক্লাসের মেধাবী ছাত্র যথেষ্ট কঠিন অংকও চেষ্টা করলে সমাধান করতে পারে, কিন্তু অনেক রসিক ও মেধাবী পাঠক, যারা নিয়মিত কবিতা পড়েন, আপনাদের নতুন কবিতা অনুভবই করতে পারছেন না বা আপনাদের কবিতালিপি তাদের মধ্যে কোনো বোধ ট্রিগার করতে পারছে না। এটা কেন হচ্ছে?
বারীনদা :- কবিতালিপিটি নয়, সেটির মধে কবির অনুভবটি বিস্তৃত থাকে। যে পাঠকের অতিচেতনা আছে সে তার করোনা বলয়ে সেই অনুভবের স্পর্শ পায়, একে ট্রিগার বলে, এখন পাঠকের মনে তার নিজস্ব কবিতাটি জারিত হয়। যে কবিতা তাকে এই জারণে সহায়তা করেছে সেই কবিতা এবং সেই কবিকে স্মরণে রাখে। কবি অতি সতর্ক ভাবে তার ভাষার মধ্যে নিজস্ব কবিতার অনুভবটি প্রোথিত করে। ব্যাপারটা হঠাৎই হয়না। যে এসব পারে না তাদের নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। রবীন্দ্রনাথের কটি কবিতার অন্তরে পাঠক প্রবেশ করে তাঁর অনুভবটি উদ্ধ্বার করেছে, আমার সন্দেহ আছে।
৭।। কবিতা থেকে তার সব প্রচলিত গুণ বাদ দেওয়ার কথা বলছেন, তাহলে নতুন ভাষায় লেখা কবিতালিপিটি যে শুধুমাত্র স্বরলিপির মতো একটি সংকেত মাত্র নয়, তা কী করে পাঠক বুঝবে? মানে, নতুনকবিতা কে কবিতা বা শিল্প বলে কী ভাবে চিনতে পারবো?
বারীনদা:-কবিতার পরিসর পাবার জন্য জীবনানন্দ-আচ্ছন্নতা কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল। প্রতিষ্ঠান যাকে মূলধারা কবিতা বলে, তার গুণাবলী মুছে, অর্থাৎ শ্লেটটি নতুন মুছে শুরু করতে হয়েছিল আমাদের। সমস্ত লিখিত আছে গদ্যে। তোমাকে পড়তে হবে। আমার ২০ বছরের সাধনা এরকম দুটো কথাতে সম্পূর্ণ হবেনা অর্ঘ্য।
৮।। যদিও প্রশ্নটা ক্লিশে তবুও জানতে চাইব__ কাঠামো না আধেয়? আপনার পক্ষপাতিত্ব কি কাঠামোরই দিকে?
বারীনদা :- কাঠামো, আধেয় দুইই অবান্তর নতুন কবিতার কাছে। ভাবনা আর অনুভূতিই আসল।
৯।। আপনি তো গল্পও লেখেন, এবং আমার নিজের আপনার অনেক গল্প বেশ ভালোও লেগেছে। দুর্বোধ্য নয় অথচ ভাষা ও শৈলীতে নতুন স্বাদ। আপনার প্রবন্ধতো অবশ্যপাঠ্য বলেই মনে করি। আপনি নিজে কী লিখতে ভালোবাসেন? ভবিষ্যতের পাঠক আপনাকে মনে রাখবে আপনার কবিতা না গদ্যের জন্য, আপনার নিজের কী মনে হয়?
বারীনদা :- লেখার সময় আমি পাঠকের কথা মনে রাখিনা। আরো প্রচারিত হবার জন্য প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী হই না। আমার কোন আত্মপ্রচার নেই। আমি কবিতা লিখতে ভালবাসি। প্রবন্ধ প্রয়োজনে লিখি নতুন কবিতার বক্তব্যকে তুলে ধরতে। তা কেবল লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যেই সীমিত। আগে গল্প লিখতাম। এখন কমে গেছে। পাঠক আমাকে আদৌ মনে রাখবে কিনা তা নিয়ে আমি ভাবিত নই। মনের আনন্দে লিখি।
১০।। এইযে আপনার নাম বললেই, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো অতটা না হলেও, অনক গালগপ্পো উঠে আসে। আপনার কবিতার চেয়ে আপনার দলবেঁধে আড্ডা, হুল্লোড়, মদ্যপান এসব নিয়ে বেশি আলোচনা হয়, এটা কি আপনি জানেন? তরুণ কবিদের কি এটাও আপনার প্রতি আকর্ষণের একটা কারণ?
বারীনদা :- ছোটবেলা থেকেই আমরা গ্রামে গঞ্জে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতাম কবিসঙ্গ করতে। বছরের পর বছর, আজও তারা আমাদের ভালবাসে, আড্ডা মারতে চায়, কবিতার আড্ডা। ছোটবেলায় দেখেছি সিনিয়ার কবিরা আমাদেরকে, আমাদের লেখালিখি এবং বইকে আমল দিতেননা। আমাদের স্বপ্ন এবং কষ্টকে গ্রাহ্য করতেন না। আমি বয়সকালে একেবারে উল্টো পথে চলি। শহর গ্রাম গঞ্জ যেখান থেকেই হোক তরুণ কবি আমাকে পত্রিকা বই দিলে আমি সবাইকে উত্তর দিতাম, আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতাম। তাই তরুণরা আমাকে বন্ধু ভাবে। আমার সাথে আড্ডা মারা পছন্দ করে, আপন মনে করে। আমি এর মধ্যে খারাপ কিছু দেখিনা। শক্তিদা মদ্যপান, গান আর কেচ্ছা, মাতলামি করতেন। আমার সে স্বভাব নেই। শক্তিদা স্বনামধন্য মানুষ। আমি কোন ছার।
১১।। এই যে কবিতার একটি নতুন পরিসর তৈরি করার জন্য আপনার দী্র্ঘ সময়ের প্রচেষ্টা, কতটা সফল হয়েছেন বলে আপনি মনে করেন?
বারীনদা :- নতুন কবিতার উন্মেষ স্থায়ী হয়েছে। নব্বই দশক থেকে অনেক তরুণ ক্রমশ আগ্রহী হয়ে নতুন কবিতা লেখার চেষ্টা করেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে সংখ্যাটি আরো বেড়েছে। মূলধারা কবিতার বাইরে যে কোন কবিতাই নতুন কবিতা। ক্রমশ তারা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া থেকে দূরে চলে গেছে। তাই বলে প্রতিষ্ঠানও চুপ করে বসে নেই। অজস্র বেনোজল ঢুকে যাচ্ছে সেখানে। আমি ঠিক জানি না। গত ৩০ বছর হল আমি সন্ধান রাখিনা প্রতিষ্ঠানের।
১২।। মূলধারার কারো কোনো কবিতাই কি আপনার ভালো লাগে না?
বারীনদা :- মূলধারার কারো কবিতাই আমার আর ভাল লাগে না। জীবনানন্দ দাশের পরে কিছুটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার ও উৎপলকুমার বসুর প্রথম দিকের ... ব্যাস।

১৩।। আপনার নতুন লেখালিখি, বা প্রকাশ হতে চলেছে এমন বই সম্বন্ধে কিছু জানান।
বারীনদা :- রোজের লেখালিখি বাদ দিয়ে বলি --- ২০১৬ জানুয়ারিতে আমার তিনটে বই প্রকাশিত হয়েছে --- ‘হারাতে হারাতে একা’ (অ্যাশট্রে প্রকাশনী), ‘আমার সময়ের কবিতা-২ (নতুন কবিতা প্রকাশনী), ‘প্রণয়ধ্বনির সফ্‌ট্‌ওয়্যার’ (এখন – বাংলা কবিতার কাগজ প্রকাশনী)। এবছর আমার একটি ‘নির্বাচিত গল্পসমগ্র’ আর ‘অন্য প্রবন্ধ’ বইদুটি প্রকাশের জন্য তৈরি হচ্ছে। এসব বই নিয়ে আমার কিছু বলা শোভা পায়না কারণ আমি আত্মপ্রচার বিমুখ মানুষ।
এত সব কচকচির মধ্যে কোথাও কবিতা তো নেই অর্ঘ্য। মায়াজম্‌-এর পাঠকদের কোন উপকারে লাগলে আমি ধন্য হবো। সোনালী এবং তুমি আমার ভালোবাসা নিও। এই বৈশাখে এই আলোচনায় আমি আনন্দ পেলাম।
বারীনদা।

স্বপ্ননীল

                          ইন্টারিভিউ













“ পথে চলে যেতে যেতে কোথা কোনখানে
 তোমার পরশ আসে কখন, কে জানে ”
ফোনের রিং টোন টা বেজে উঠতেই ধরমরিয়ে উঠল অভিমান , রোববার এর অলস দুপুরে একটা লেখা নিয়ে বসেছিল ,সুরজিত দা বলেছিলেন কি হল জানাবেন , হ্যাঁ ঠিক সুরজিত দারই ফোন , ও উত্তেজিত হয়ে বলল বলুন দাদা নিতে পারলেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ?
খুব ছোটবেলায় বাবা মারা যায় অভিমানের। ওর মা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে ওকে বড় করেছেন। ডাক্তার ,ইঞ্জিনীয়র নয়, চেয়েছিলেন ছেলেকে একটা ভাল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে। খুব সাধ করে ছেলের নাম রেখেছিলেন “অভিমান”। অভিমানকে স্কুল , কলেজে , পাড়াতে সবাই খুব ভালবাসে। মিশুকে সদাহাস্যময় ছেলে হিসাবে অভিমানের খুব নাম-ডাক। লেখালেখির অভ্যাসও আছে ছোট থেকেই,স্কুল কলেজের ম্যাগাজিনের সম্পাদনাতে চিরকাল অভিমানের নাম থাকত।
 তাই বাংলাতে এম এ পাশ করার পরও খুব আগ্রহ নিয়ে জার্নালিজ্ম্ পড়তে শুরু করল । ছোটবেলা থেকেই ওর খুব প্যাশান সাংবাদিকতায় ,ভালভাবে পাশও করে গেল। এবার চাকরীর চেষ্টা। মা আর কত দিন টানবেন সংসার । কত বড় বড় জায়গাতে ইন্টারভিউ দিয়ে আসে কিন্তু কিছুই হয় না। অবশেষে এক স্নেহশীল দাদার পরিচিতির সূত্রে একটি সান্ধ্য পত্রিকার জুনিয়র জার্নালিস্ট হিসাবে জয়েন করল। ওর কাজ হল ফিচার বিভাগে বিভিন্ন সেলিব্রিটির ইন্টারভিউ জোগাড় করে আনা ।

খুব খুশী হল অভিমান এইরকম একটা কাজ পেয়ে। কিন্তু একটা কথা আছে না—“Man proposes god disposes” অনেক চেষ্টা করেও নামী কোন সেলিব্রিটির অ্যাপয়েন্টপমেন্ট জোগাড় করতে পারল না ।

এক মাস যায়, দুমাস যায় ছুটকো ছাটকা লেখালেখিতে এডিটরের মন ভরে না। অবশেষে একদিন এডিটর ওকে বলেই দিলেন—দেখো অভিমান এই মাসই শেষ যদি কোনো নামী কারও ইন্টারভিউ না আনতে পারো। দিশাহারা হয়ে ঘুরতে থাকল অভিমান। অবশেষে এক সিনিয়র দাদা সুরজিতের চেষ্টায় ও বিখ্যাত অভিনেত্রী লাবণ্য সরকারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেল ৩০মিনিটের জন্য । কিছুটা আনন্দ, কিছুটা টেনশনে রাতে ঘুমোতে পারে না অভিমান। সারা রাত ধরে ভাবনাগুলোকে গুছোতে থাকে, আগামীকাল লাবণ্য সরকারকে ঠিক কি কি প্রশ্ন করা যেতে পারে যা আগে কখনও - গতানুগতিক প্রশ্নের বাইরে নতুন কিছু প্রশ্ন ভাবার প্রাণপণ চেষ্টা করে , এইভাবেই রাত ভোর হয়ে যায়। কিন্তু কি প্রশ্ন করা যেতে পারে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। তারপর ভাবতে থাকে-- ঠিক আছে, সময় তো আসুক তখন না হয় আগে থেকে ভাবলেই বরং সব গুলিয়ে যেতে পারে ।
 ওর সবচেয়ে প্রিয় নীল শার্টটা পরে, প্রিয় বডি স্প্রে গায়ে ছড়িয়ে মাকে প্রণাম করে বেড়িয়ে পড়ে লাবণ্য সরকারের বাড়ির উদ্দেশ্যে। ঠিক সময়ের আগেই পৌঁছে যায় ওখানে , কারণ ওদের তো আবার সাঙ্ঘাতিক এক অ্যালার্জি থাকে টাইমিং নিয়ে ,সময়ের ব্যাপারে জ্ঞান খুব টনটনে। দেরী হলে আবার যদি অ্যাপয়েন্টমেন্টই ক্যান্সেল করে দেন উনি ।
 বিশাল ড্রয়িং রুমে বসে ঘামতে থাকে অভিমান , মনেমনে বেশ স্মার্ট ভাবতে থাকে নিজেকে। কিন্তু তখনও ভেবে উঠতে পারে না ঠিক কি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। সুরজিৎদা ওকে অনেক করে শিখিয়েও দিয়েছিল কি কি প্রশ্ন করতে হবে , কিন্তু ওর সবই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকল ।
 অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শ্রীমতী সরকার এসে বসলেন সামনে। অভিমান অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল—এঁকেই কি আমরা টিভির পর্দায় দেখি ! ঠিক মার মত করে আটপৌরে শাড়ি পড়া , চুলটা খোলা ! কিছুতেই কিছু মেলাতে পারল না ও……
ওর এই অবস্থাটা বুঝতে দেরী হল না লাবণ্য দেবীর। ওকে একটু স্বাভাবিক করার জন্য নিজেই বললেন—তুমি অনেক ছোট, তাই তোমাকে তুমি করেই বলি। বলো, কি জানতে চাও ?
অভিমান একটু ধীরে বলল—আপনার সম্পর্কে তো কিছুই অজানা নেই আমাদের , আপনি কি খান, কি পড়েন, কার সঙ্গে কোথায় বেড়াতে যান, ছবি পিছু কত টাকা পারিশ্রমিক পান, বাংলার ঘরে ঘরে এ তথ্য সবার মুখস্ত। এমন কিছু বলুন না যা কেউ জানে না আগে কাউকে বলেন নি ।

আপনাকে সত্যি কথাই বলি—এই ইন্টারভিউর উপর আমার চাকরী নির্ভর করছে। একটা ভাল ইন্টারভিউ নিয়ে যেতে না পারলে হয়তো এমাসেই আমার চাকরী শেষ , এডিটর সেরকমই বলেছেন ।
 অভিমান আরও কিছু বলতে চলেছিল কিন্তু শ্রীমতী সরকার ওকে থামিয়ে দিলেন—তোমার হাতে সময় আছে??
অভিমান লাফিয়ে ওঠে—হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার কোন তাড়া নেই……
তাহলে তুমি একটু বোসো, ভেতরে আমার হেয়ার ড্রেসার বসে আছেন , আমি একটু কাজ সেরে আসি। তারপর তোমাকে এমন কিছু শোনাবো যা এর আগে কোনদিন কাউকে … বুঝলে…… তুমি কি চা-কফি কিছু খাবে?
না, মানে, একটু জল.
ওকে, তুমি বোসো আমি চা জল পাঠিয়ে দিচ্ছি । এই বলে উনি ভেতরে চলে গেলেন .অভিমান বসে বসে ভাবতে লাগল এইবার বোধহয় ওর কপালে শিকে ছিঁড়ল, এতো দিনে। সকালে মাকে বলে এসেছে কাল ওর একটা লেখা বেরোবে , মা গোপাল ঠাকুরের কাছে মানত করেছে। এইসব নানা ভাবনার মাঝে ও ভাবতে লাগল, ছোট বলে কি ওর সাথে উনি মজা করলেন ! না না, দেখে তো বেশ অমায়িকই মনে হল ।

সোফার পাশে একটা টেবিলে খানকয়েক খবরের কাগজ রাখা সেখান থেকে একটা তুলতে গিয়ে চোখে পড়ল একটা খোলা ডায়েরী উল্টে রাখা । খুব কৌতূহল হল ওর ডায়েরীটা দেখার যদি কোন না জানা তথ্য পাওয়া যায়! এদিক ওদিক দেখে ডায়েরীটা তুলেই নিল। যে পাতাটা খোলা ছিল সেখান থেকেই ও পড়তে শুরু করল……

কিছুক্ষণ পড়ার পর ও রীতিমত ঘামতে শুরু করল এসব কি লেখা ডায়েরীতে…! কি লিখেছেন শ্রীমতী সরকার ,উনি লাস্ট তিন বছর ধরে ক্যান্সার পেশেন্ট , কেউ জানে না সেকথা ! অভিমান গোগ্রাসে গিলতে থাকল ডায়েরীটা। যদি আরও কিছু ইনফর্মেশন পাওয়া যায় কাল এই নিউজটা যদি ওদের পেপারই ফার্স্ট দিতে পারে তাহলে ওর চাকরীটা কনফার্ম হয়ে যাবে !একদম ব্রেকিং নিউজ - মনেমনে ও অনেককিছুই ভেবে ফেলল। কলকাতার সব বড় বড় এডিটররা অবাক হবেন ভেবে ওর মত একটা সাধারণ ছেলে কি করে এমন একটা খবর জোগাড় করল। সুরজিৎদাও খুব খুশি হবে। এরকম নানা চিন্তার মধ্যেই ও ডায়েরীটা পড়তে থাকল তবে কি শ্রীমতী সরকার এই কথাটাই ওকে শোনাবে বলেছিলেন !

ঘামতেই থাকে অভিমান কি করবে এখন ভেবে পায় না। এটাই তো একটা বিরাট খবর ! এইসময় শ্রীমতী সরকারের পায়ের আওয়াজ পেতেই ডায়েরীটা রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়াল
 সরি, তোমাকে অনেক্ষণ বসিয়ে রাখলাম ।

অভিমান তাড়াতাড়ি কয়েকটা ফর্মাল প্রশ্ন করে বলল—আচ্ছা আমি একটা লেখা মনে মনে ভেবেছি আপনাকে নিয়ে ,সেটা লিখে এনে যদি দেখাই ,আপনি যদি আর এক দিন সময় দেন প্লিজ । লাবণ্য একটু অবাক হলেন—আমার না বলা গল্পটা শুনে যাবে না ! সেটা না হয় কাল আপনাকে আমি দেখিয়ে নিয়ে যাব ,তার মানে তুমি জান আমার না বলা গল্প !
অভিমান বলে ওঠে—মনে হয় কিছু কিছু জানি

লাবণ্য বললেন—ইন্টারেস্টিং বেশ , তুমি তবে কাল না পরশু এসে আমাকে দেখিয়ে যেও কি লিখলে , ছাপতে দেওয়ার আগে ।

থ্যাংক্স জানিয়ে অভিমান চলে গেল। সারা রাত জেগে সুন্দর একটা ফিচার লিখে ফেলল । মা কে ডেকে লেখা টা শোনাতেই মা বলল তুই কি করে জানলি এই খবর টা ?উনি নিজেই বললেন তোকে ? তখন অভিমান মা কে ডাইরির গল্প টা বলল , ওর মা একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিঃ বলে উঠে চলে গেলেন । ওর মা কে ও চেনে ছোট বেলা থেকে । না বলে অন্যের ডাইরি পড়ার মত অপরাধ মা কিছুতেই সমর্থন করবে না । পরে মা কে বুঝিয়ে ম্যনেজ করে নেবে ঠিক ।আবার মনে মনে ভয় ও পেল যদি ডাইরি পড়ার অপরাধে উনি ইন্টারভিউ টাই কান্সেল করে দেন , না কাজ টা ঠিক হয় নি ।

একদিন বাদে এল আবার ও শ্রীমতী সরকারের বাড়ী । লাবণ্য দেবী খুব আগ্রহ সহকারে লেখাটা পড়লেন। তারপর কিছুক্ষণ একটু গম্ভীর হয়ে থেকেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন , হো হো করে হাসতেই থাকলেন। অভিমান কিছু বুঝতে না পেরে বড্ড অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল ।
 ওর এই অবস্থা দেখে লাবণ্য বললেন—আসলে, ঐ ডায়েরীটা আমার এক খুব প্রিয় বান্ধবীর ও আমাকে পড়তে দিয়েছিল। আর তুমি ভাবলে আমি? সাংবাদিক রা এত বোকা হয় নাকি , এই বলে উনি আবার হেসে উঠলেন……
অভিমান যেন এক মূহুর্তেই ফিউজ হয়ে গেল। একটু আমতা আমতা করে বলল—তাহলে, আপনার না বলা গল্পটা…?
লাবণ্য বললেন—বোসো, ভেতরে আমার হেয়ার ড্রেসার অপেক্ষা করে আছেন ।

সৌরাংশু সিংহ




(১)
বেয়ারাটা নীল টুরিষ্টারটাকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বখশিশ নিয়ে সেলাম ঠুকে চলে গেছে। রুম সার্ভিসে ফোন করে এক প্লেট চিকেন স্যালাড পাঠাতে বলে দিলাম। সিগনেচারের বোতলটা টুরিষ্টারের আনাচে কানাচে কোথাও ওঁত পেতে বসে আছে।
পিঠের ঝোলাটা থেকে নীল রাত পোষাকটা বার করে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষন- রূপম ছোঁড়াটা একটা গান লোকের ঠোঁটে ঝুলিয়ে দিয়েছে বেশ “নীল রঙ ছিল ভীষণ প্রিয়... তাই নীল রঙে মিশে গেছে লাল...”
নিজের দীর্ঘশ্বাসের শব্দে চমক ভাংলো, রাত পোষাকটা বাথরুমের বাইরে ড্রেসিং টেবিলে রেখে মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটা এসএমএস করলাম ‘I’m fine- bz 4 few days, will b back on 7.’
সুইচ অফ করে রাখলাম- ২০ বছর পড়ে যখন ছেলে গ্র্যাজুয়েশনের পথে তখন মনযোগ কারুর জন্য পড়ে থাকে না- শুধুমাত্র ভবিষ্যতের সুরক্ষায় হাত না পড়লেই হলো।
এদের ব্যবস্থাপনা আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে-বাথটাবের সুদৃশ্য আনুষাঙ্গিক দেখে ভাবলাম- সময় পালটায়- সময় এগিয়ে যায়- মানুষ পিছিয়ে পড়ে তাল মেলাতে না পেরে।
জলটা হালকা গরম হয়েছে- নিরাবরণ শরীরটাকে ডুবিয়ে দিলাম তাতে- মনটাও...

(২)
'हर आहट पे तेरी जुस्तजू जिन्दा होती है..'(হর আহট পে তেরী জুস্তজু জিন্দা হোতী হ্যায়)
সময় গড়াতে লাগল পিছন পানে- পনের বছরের কাছে পৌঁছে কাঁটাটা এদিক ওদিক দুলতে থাকল।
......
“पता है, जिन्दा हूँ मैं, मुझे भी हैरानी होती है-
तुझे भी पता है के नही शास लेती हूँ मैं...”
(পতা হ্যায়, জিন্দা হুঁ ম্যায়, মুঝে ভী হ্যায়রানী হতী হ্যায়
তুঝে ভী পতা হ্যায় কে নহী, শ্বাস লেতি হুঁ ম্যায়।।)
ইনল্যান্ডটা টেবিলের উপরে রেখে মনকে বলেছিলাম-“এবারে তাহলে সাগরে?”
মনের টান যে বড় টান- যুক্তি তক্ক গপ্পোর একশো হাত দূর দিয়ে যায়- আমার তো কথাই নেই- পারি না, করি না, দেখি না, শুনি না- কিন্তু মনকে ছেড়ে দিই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
দু-তিনদিনের ব্যপার- ঋজুর পরীক্ষা ফুরিয়েছে, মামাবাড়ি গেছে ওরা। ঝাড়া হাত পা এখন। অফিসের ছুটি জমে জমে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শুকিয়ে যায়- নিরস লোক আমি- ছুটি পেতে দেরী হয় না- নীলে মুড়ে বেড়িয়ে পড়ি নীলের সন্ধানে।
কত বছর? দশ হয়ে গেছিল কি? দশ- আমার নির্বাক নিশ্চুপ বছরগুলো। দশ-আমার পাথর চাপা বছরগুলো। দশ- আমার গতানুগতিক বছরগুলো...
দেড় দিনের ট্যাক্সি ট্রেন বাস পেড়িয়ে এসে দাঁড়ালাম সেখানে, যেখানে তিন সমুদ্র মিলিত হয়েছে।গান্ধীধামের ছাদের উপর- বিদিশার নিশার মতো চুলগুলো মুখে লাগছিল- একটা ছিম ছাম মিষ্টি গন্ধ। সামনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠেছিল-
“মুঝে পতা থা...দোস্ত নেহী হ্যায় মেরা... তুম ভি তো নেহী হো... কেয়া হো তুম?”
হঠাত মাথায় দুষ্টুমি খেলে গেল, মিচকে হেসে বললাম “লাইট হাউস।“
তাকালো সে, কতদিন পরে? কতদিন? পাল্টেছে কি? হবে হয়তো কিন্তু চোখের গভীরতা তো একই আছে- ভাঁজগুলো আরও গভীর হয়েছে আর চুলও হয়েছে বড়- মিষ্টি হাসিটা খেলে গেল তার মুখে
“এক নম্বর কা বদমাশ হো তুম- স্মার্ট হো গয়ে হো- শাদীকা ফল মিঠা হোতা হ্যায়, বোলো?” হাসলাম- আবার একটু মেঘ খেলে গেল- রেলিঙে ভর দিয়ে বলল “পতা নেহী মুঝে হামেসা সে হি করেলা বহুত পসন্দ হ্যায়- শেহদ হজম নেহী হোতি...”
স্যালাডটা দিয়ে গেছে- আজ আর বেশী খাব না- একটা পেগ নিয়ে বারন্দায় এসে বসি- হালকা ঠান্ডা আছেই। আজ ঘুম আসবে না বোধহয়।
ঘুম তো সেদিনও আসে নি- একফালি চাঁদ ঘুমোতে দেয় নি যে- ঝড় উঠেছিল সেদিন- আগুন লেগেছিল সাগরে।
তারও আগে একদিন ছিল- মনে রঙ ছিল- অন্ধকার আকাশটায় রামধনু পোঁচ পড়েছিল- হালকা বৃষ্টি, মন ভিজেছিল সেদিনও- নাকি সেদিনই ভিজেছিল মন প্রথম...
“Are you a photographer? Of course having a camera does not qualify you as one. I do freelancing. But currently on a pilgrimage- to have peace with myself. Oh! Hi! I am Anita, Anita Shroff…”
হাতটা এখানেই ছুঁয়েছিল হাত- না ঠিক এখানে নয়, কিমি ১৫ দূরে পাহাড়ের ধারের একটা চায়ের দোকানে- চুল ছোট ছিল অনেকটাই- ছিল না মেক আপের প্রয়োজন। অবশ্য মেক আপের প্রয়োজন কখনই ছিল না অনিতা-র, অন্ততঃ আমার কাছে- কি দেখেছিল কে জানে? প্রশ্ন করলে বলত না কিছুই- মুখ নামিয়ে হাসতো নিজের মধ্যে, আর চোখটা চক চক করতো। একবারই খালি লিখছিল-
“You know, what you are? When I am lost in the dusty lanes with flutter of questions and nowhere to go, I see thy face comes out of the dark with the plate in hand full of answers. Yes, you are my answer, I always knew you have them, I will always know…”
না অনিতা, প্রশ্নের উত্তর নেই আমার কাছে- নেই নেই- ছিল না কোনোদিনই। হাঁপিয়ে যাই- সাধারণ ভাবে প্রতিটি পূর্বনির্ধারিত পদক্ষেপে মিলিয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে- ভিতরটা বিদ্রোহ করে- কিন্তু আমি তো তুমি নই অনিতা- আমার যে একটা স্পষ্ট ছবি আছে- তাতে তো একটাও অস্পষ্ট দাগ নেই, সবই তো সেই নিখুঁত, cut to cut.
বাইরের কুয়াশা ডান গাল বেয়ে কখন যে নেমে আসে... অর্ধভুক্ত প্লেটটা বাইরেই রেখে উঠে আসি- সিগনেচারকে ঘুম পাড়াতে। আমি জেগে থাকি কড়িকাঠ হীন সিলিং ভেদ করা দৃষ্টি নিয়ে। ধীরে ধীরে তাও ঝাপসা হয়ে আসে- ভোর হয়- চোখ খুলে দেখি- পর্দার ওপার থেকে দেবদারুর মাথা ছুঁয়ে সূর্যের এলার্ম- যাত্রা শুরু হবে আজ।

(৩)
সাড়ে সাতটায় গাড়িটা এল- তার পর পয়তাল্লিশ মিনিট- ধাবাটা যেখানে ছিল- সেখানে একটা ছোট্ট খাট্টো মোটেল- The Nilgiris-সময় নষ্ট করার মানে হয় না- তাই তার পাশ দিয়ে ট্রেকিং শুরু করলাম- ক্যাননটা রুকস্যাকে রেখে- শরীরটা জুত ছিল বলে- বিশেষ অসুবিধা হলো না।
ঘন্টা দেড়েক লাগল- গতবারের থেকে কুড়ি মিনিট বেশী- যদিও এবার একাই চড়ছি- তবুও পথের থেকে পথ প্রদর্শকের আকর্ষণ ছিল বেশী সেবারে।
“You know, there is a better place, an hour’s hike from here. Let’s go.”
এক প্রকার হাত ধরেই টেনে নিয়ে গেল আমায়- মন্ত্রমুগ্ধের মতো চড়তে শুরু করলাম। কখনো খাড়াই কখনো একটু সমতল- তবে অনিতার সঙ্গে তাল মেলানো বেশ মুশকিল হচ্ছে। অনিতার সে দিকে যে বিশেষ নজর আছে সেটা বলে মনে হচ্ছে না- নিজের মনেই বক বক করতে করতে উঠছে- কিছু কানে ঢুকছে কিছু ঢুকছে না- শুধু নিশিডাকের মতো কিসের আহবানে উঠেই যাচ্ছি উঠেই যাচ্ছি! একবার বোধহয় পা ফস্কেছিল- খপ করে একটা শক্ত হাত ধরে নিল আমার বাড়ানো হাতটাকে- দ্বিতীয়বারের জন্য- ভরসা জাগানোর মতো হাত- বিহবল হয়ে তাকিয়েছিলাম- বলল-
“লাগতা হ্যায় লড়কি নেহী দেখা জিন্দেগী মে”।
আঁতে ঘা লাগল, “নেহী নেহী...” বলতে গিয়েও ভাবলাম প্রথম পরিচয়ে সব কিছু খুলে বলাটার নাম বোধহয় আদেখলাপনা। মৃদু হাসলাম- খোঁচাটা তখনও চলছে-
“হায়, ম্যায় মর জায়ুঁ...লাগতা হ্যায় মেরা Assessment গলত হ্যায়”। মিচকে হাসি- উত্তর দিলাম না, সামলে নিয়ে বললাম “চলে?”
ঘন্টা খানেক পরে একটা চাতালের মতো জায়গায় উঠে এলাম- সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম... “হামিনস্ত হামিনস্ত হামিনস্ত”। এখানেই স্বর্গের একটুকরো creation of Adam-এর মতো দেবলোক থেকে নেমে এসেছে। ভারতবর্ষের মধ্যেই যে এত সুন্দর এক ফোঁটা স্বপ্ন লুকিয়ে আছে জানা ছিল না।অনিতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম- আমার দিকে দেখছে না আর- দু হাত ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, বুকটা অবাধ্য ঢেউএর মতো ওঠা নামা করছে- চোখ বন্ধ করেই বলে উঠলো-
“You know, every time, every time I come here- the clouds, the silent clutters of lonely trees, the misty air of foregone mountains, the vibrations of unseen river flow through my veins. Feel it, can you? Breathe, breathe, breathe... Bring it out, your passion, your pleasure, your existence all will be culminated in one breath. You listen to it Dear, দিল পে লে লো ইসে.....”
কিছু বলার ছিল না তখন- খালি মন ও শরীর জুড়ে বিদ্যুতের চলাফেরা অনুভব করলাম আর অনুভব করলাম অবর্ণনীয় মহাজাগতিক চেতনাকে ... “হামিনস্ত হামিনস্ত হামিনস্ত”।
বছর ২৫ পরে তার একটু কি পরিবর্তন হয়ে গেছে? খালি খালি লাগছে? জানি না- জানার চেষ্টা করলে একগুচ্ছ প্রশ্ন মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু করবে- যার উত্তরের জন্য এখনো তৈরী করতে পারি নি মনকে। ভাবলাম কিছু কিছু প্রশ্ন অনুত্তরিত থাকলেই ভালো। মাটিটা ভোরের শিশিরের ছোঁয়ায় ভিজে আছে- চিত হয়ে দু হাত ছড়িয়ে শুলাম! সারা পৃথিবীর ভালোলাগা ভালোবাসা দু হাতে জড়ো করে নিলাম- মনের আয়নায় একটা মুখ- তির তির করে কাঁপছে- ভালো লাগা না কি হারানো সুরের ঝঙ্কার? একটা দ্বীর্ঘশ্বাস পড়লো...
কিছুক্ষণ... তারপর উঠে পড়লাম। খামখেয়ালি ক্যামেরায় যত্নশীল প্রকৃতির আঁকি বুকি ধরার খানিক চেষ্টা- তারপর বসলাম শান্ত হয়ে, একটা পাথরের উপর।
রুক স্যাকটা থেকে একটা বাক্স বার করলাম-দীর্ণ জীর্ণ তার অবয়ব। আমার মন? খুললাম তাকে। থরে থরে সাজানো হৃদয়ের ইতিহাস- রক্তক্ষরণ নাকি সুগন্ধ?অভস্থ আঙুলের টানে উঠে এলো একটা কাগজ- খুললাম।
পুরোনো রুলটানা খাতার পাতা- পড়তে পড়তে এক জায়গায় চোখ আটকে গেল-
“A red rose craved for a bunch of bees, but was always bereaved of them. But she always dreamt in night that the heaven is full of bees and when night falls all the bees fly down to drench the rose with soft kisses. It never happened of course. One night, the full moon asked the rose. “Why do you wait as you always knew this will never be reality?” “Its not just waiting, but keeping yourself open so that I can live the next day. I want to live the next day, the next and the next…” You know na... হর কিসিকো মুকম্মল জাহাঁ and blah blah blah?”
দুটো ভেজা ঘাস তুলে রাখলাম কাগজটার ভিতর- বেশ কয়েকটা কাঠি খরচ করে তবে আগুনটা জ্বলল- কালো কালো প্রজাপতিগুলো উড়ে গেল সূর্যের দিকে- চোখ বন্ধ করে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ, অনিতা বোধহয় কাছে পিঠেই কোথাও আছে।
নেমে গিয়ে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলাম পাশের গ্রামের উদ্দেশ্যে পা বাড়াবার জন্য! মিনিট পঁচিশের ড্রাইভ- পঁচিশ বছর পেরিয়ে এলাম। সেবার একটা লজঝরে জীপ জোগাড় করেছিল অনিতা। জিজ্ঞাসা করেছিলাম “পেলে কোত্থেকে?” থামিয়ে দিয়ে বলছিল- “সওয়াল বহুত করতে হো- বুরি আদত...”
নাহ, প্রশ্নগুলোকে কোনোদিন প্রশ্রয় দিই নি আর। সেদিন যখন বলেছিল, “চলো ভাগ চলে- কোই হামে ঢুন্ড নেহী পায়ঙ্গে” প্রশ্ন করি নি কোনো, মাথা নীচু করেছিলাম- প্রশ্ন ছাড়াই উত্তর পেয়ে গিয়েছিল অনিতা। “ডরপোক নেহী, বুঝদিল হো তুম”। বলতে পারি নি- “আমার বাড়িতে মানবে না অনিতা- আর মাকে কষ্ট দেবার মতো নিষ্প্রাণ এখনো হয়ে উঠতে পারি নি গো”।
অনিতা বুঝেছিল- বা হয়তো বোঝে নি- পরের দিন সকালে আর খুঁজে পাই নি- একটা চিঠি ছিল বেয়ারার হাত দিয়ে পাঠানো-
“हर एक से पूछा शबाब उसके न मिलने का
हर एक ने बताया के वो मेरे लिए बना ही नहीं...
(হর এক সে পুছা শবাব উসকো ন মিলনে কা
হর এক নে বতায়া কে ও মেরে লিয়ে বনা হী নহী)
Blue suits you superbly as you are Neelkantha, who sips all the blues from my darkness. Stay put and be happy Dear. You are really unique….
इक ज़रा सा गम-इ दौरा का भी हक है जिस पर
मैंने वो सांस भी तेरे लिए रख छोड़ी है”।।
(ইক জরা সা গম-এ দৌরা কা ভী হক হ্যায় জিস পর
ম্যায়নে ও শ্বাঁস ভী তেরে লিয়ে রখ ছোড়ী হ্যায়)
নীচে কোনো সাক্ষর ছিল না... অনেক না বলা কথা, না নেওয়া নিশ্বাস না দেখা চোখের জল রাখা ছিল বোধহয়। না বোঝা অনেক ভাষা না জোড়া অনেক তার জমা হয়েছিল আমার মনেও...

(৪)
গ্রামটা এখনো সেই রকমই আছে- সেই মায়ায় জড়ানো- আধবোজা চোখে চেয়ে থাকা- দুলকি চালে জীবন চলে- পরিবর্তনের মধ্যে বাড়িগুলো পাকা হয়েছে, দু তিনটে ডিশ বাড়ির ছাদে আর কয়েকটা কেবলের আর বৈদ্যুতিক তার কাটাকুটি খেলছে। ভালো করে ঠাহর করলে দেখা যাবে- পথ ঘাট বাঁধানো, কয়েকটি মোটরচালিত সাইকেল এবং বেশ কিছু তিন চাকার গাড়ি এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে- তা এটুকু তো আশা করা যেতেই পারে।
এক বাক্স টফি ছিল, বাচ্চাদের মধ্যে বিলি করলাম-ইতস্তত বড়রাও উঁকি ঝুকি দেওয়া শুরু করল। কয়েকজন মাতব্বর প্রশ্ন করছিল- ‘কাগজের লোক’ ‘রাইটার’ ইত্যাদি বলে ম্যানেজ করলাম!
কিছু পরে একটা আধবুড়ো লোক এগিয়ে এলো- দেখে টেখে মোড়ল বলেই মনে হলো- জিজ্ঞাসা করল “আপ কিসিকো ঢুন্ড রহে হো কেয়া?” মুখটা চেনা চেনা লাগল- ছোট চোখ চোখা নাক ফরসা রঙ- চোখের নীচের চামড়া একটু কুঁচকেছে- পিঠটা একটু বাঁকা। একটু ইতস্তত করে বললাম- “অনিতা স্রফ?” লোকটার চোখ দুটো চক চক করে উঠলো পুঁতির মতো। “ভাইয়াজি, পহচানে নেহী? ম্যায় জোগিন্দার হুঁ, জোগিন্দার বিস্ত- দিদি আপকে বাতে কিয়া করতি থি। আপ বহুত দিন পহলে আয়ে থে দিদি কে সাথ- আপ শায়দ মুঝে পহচান নেহি পায়ে।” মুখের মিলটা খুঁজে পেলাম এবার- সেবার যখন এসেছিলাম বছর চল্লিশের লোকটা খুব বাধ্য ছাত্রের মতো সঙ্গে সঙ্গে থাকছিল- অনেক ব্যাপারেই অনেক সহযোগিতা করেছিল- অনিতা এখানে বাচ্চাদের একটা স্কুলের ব্যাপারে অনেক সাহায্য করেছিল- একটা আত্মার যোগাযোগ তো ছিলই- যে কোনো unconventional কাজের প্রতি অসম্ভব উতসাহ দেখেছিলাম মেয়েটার- যা কিছু নিয়ম মতো চলে সবেতেই বিতৃষ্ণা- সবই খারাপ-
“ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা আঘাতে আঘাত কর
ওরে আজ কি গান গেয়েছে পাখী এসেছে রবির কর।।”
অনিতা সেই রবিরশ্মির খোঁজেই তোলপাড় করত- নিজেকে, সারা বিশ্বকে- কে জানে শেষ পর্যন্ত পেল কি না?
দুপুরের খাবারটা বিস্তজীর বাড়িতেই সারলাম- সাধারন ডাল- ভাতও আপ্যায়নের গুনে অমৃত হয়ে ওঠে। বিস্তজী নবনির্মিত স্কুলবাড়িটা ঘুরে দেখালেন- আসার সময় গাড়ির কাছে এসে পকেট থেকে একটা পুরোনো বাসি চামড়ার ছোট্ট প্যাকেট বের করলেন, আমার হাতে দিয়ে বললেন, “দিদি নে দি থি, আপকে লিয়ে?” অবাক হলাম- জানলো কি ভাবে? নাহ, প্রশ্ন তো করবই না... গাড়ী চলতে শুরু করল। প্যাকেটটা খুললাম- একটা কাঠের গলার হার- চমকে গেলাম দেখে। পুরানো, রঙ চটে গেছে কিন্তু ছোঁয়াটা সেই থেকেই গেছে- গ্রাম্য মেলা থেকে আপাত নিরীহ সস্তা একটা উপহার আমার কাছে তখন মুক্তোর মালার থেকে কম কিছু লাগলো না। চিঠি ছিল কি? নাহ সে রকম কোনো আভাস পেলাম না!
হোটেলের সামনের ঢালু জমিটার উপর সব থেকে লম্বা ঝাউগাছটার নীচে কবর দিলাম তাকে- তাকিয়ে থাকলাম উথাল পাথাল জমিটার দিকে- জীবনরেখার ওঠা নামা জীবনপথের এক কোনে পড়ে থাকল- আমি ছাড়া কেউ জানলো না যে মাটির বুকে কি ঐশ্বর্য বিলীন হলো- মাটিতে এক টুকরো ভালোবাসা মিশে গেল।
মনটা কিরকম অন্য রকম হয়ে আছে বলে বোঝাতে পারব না- অদ্ভুত একটা দোলাচল- যাকে যেমন ভাবে ভেবেছিলাম সে কি সেটুকুই? ব্যাপ্তিকে বুঝতে পারি নি তার? অক্ষমতা আমারই। নশ্বর মানুষ মাত্র- ছুঁতে চেয়েছিলাম হাত দিয়ে- কাঁচের মনে করে নাড়া চাড়াও করতে পারি নি- কিন্তু মন দিয়ে ছুঁতে পেড়েছি কই? ব্যালকনিতে বসে ভাবছিলাম।
দু একজন বোর্ডার হয়তো একটু উতসাহ নিয়ে কথা বার্তা বলতে এসেছিল- কিন্তু আমার মনটা জলের মতো টল টল করছে- সেটা নিজের কাছেই রাখার মানসিকতা উষ্ণতা উতপন্ন করতে পারে নি। একা থাকি না একটু? একা? থাকি নি তো কোনোকালেই- সব সময় তো অন্যের জন্য বাঁচলাম- অনিতা জিজ্ঞাসা করেছিল চিঠিতে
“Do you know how to breathe for your own? Your every heart beat is for others. Even when you reply to my madness- it’s only that you care for me and not that you really desire to do so…”
কি করে বুঝেছিল কে জানে? হয়তো আমার চিঠিগুলোতে আমার কথা থাকতো না- কি লিখতাম? আমি খুশী আছি- তুমি খুশী থাকো, ইত্যাদি লিখতে গিয়ে পেনের গতি মুখে চড়া পড়তো। কি করে লিখি? ভাবিই নি কোনোদিন আমি কিসে খুশী? অন্যের খুশীকেই নিজের খুশী হিসাবে ধরে নিয়ে পরিতৃপ্ত থাকাটা খুব সুন্দর শিখে নিয়েছিলাম- মনকেও শিখিয়ে দিয়েছি- কিন্তু কত দিন?
মন বলে উঠল- “আমার মন যখন জাগলি না রে... মনের মানুষ এলো দ্বারে......” কাজ করা গ্লাসটায় চুমুক মারলাম- না, মাতাল আমি হবো না- আমার চিন্তন এই কটা দিন আর হারিয়ে যাবে না! প্রতিটি মুহুর্ত তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবে- প্রতিটি চমক, প্রতিটি জানা, প্রতিটি মুহুর্তের প্রতিটি অজানা- প্রতি হৃদস্পন্দনে অনুভব করবে সে।
রাত বাড়ে, টলো মলো পায়ে একরাশ অনুভব নিয়ে ফিরে গেলাম অচিন্তের কোলে- কাল আরেক নতুন চলা- নতুন করে জানার চেষ্টা- অনিতা স্রফ, অনিতা, নীতা, এনী, এনিটা...... কে? কে? কে সে? আমার সে কে?
ভোর এল নতুন আলো নিয়ে, বেড়িয়ে পরলাম- কালকেই ঠিক করে ফেলেছি- জীবনের আরামকেদারায় বসে এই সফর করব না। Comfort level-এর বাইরে বেড়িয়ে এসে অনিতাকে খুঁজে পাওয়া যাবে বলেই বিশ্বাস জন্মাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। তাই সূর্যের সঙ্গে সঙ্গেই উঠে পড়ে বাস টার্মিনাসের দিকে এগিয়ে গেলাম- ড্রাইভারকে বললাম বিল যথা জায়গায় পেমেন্ট হয়ে যাবে আর সঙ্গে যেতে হবে না- দুশো টাকা বকশিশ দিলাম আমার নতুন পথের প্রথম সারথীকে।

(৫)
সাধারণ যাত্রীবাহী বাসের আরাম বহুদিন সহ্য করি নি- কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই অসুবিধাগুলো সুবিধার সঙ্গে মিশে গিয়ে গা সওয়া হয়ে গেল- ভোরের দিকে শিশিরের ঘুম ভেঙে উঠে ঝাউপাতার ডগায় যখন আলোর প্রবেশ ঘটে তখন থেকেই যেন দিনের রূপবদল শুরু হল- সমতলে নামতে নামতে দিন নিজের রূপে প্রকাশিত হতে শুরু করল।
এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখলাম যে প্রকৃতি আমার মনের সঙ্গে এই পথে মিশে যায়-পঁচিশ বছর আগেও দেখেছিলাম শুধুমাত্র অজ্ঞানতা বশত চিনতে পারে নি- আমার মনে তখন অঝোরে ঝরছে- কোনোকিছুকে পেয়েও না পাওয়ার আকুতি- জাল ছিঁড়ে বেরোতে না পাবার জ্বালা- শূন্য মনের আপাত ভাবলেশহীনতা- সব মিলিয়ে বাইরের অবিরাম বরিষণের সঙ্গে সঙ্গে অস্পষ্ট হয়ে মুছে মুছে যাচ্ছে। আমি যেন সেই সব পেয়েছির দেশ থেকে বিতারিত- পালাতে চাইছিলাম কিন্তু সময় পেরিয়ে গেছে- রোদ্দুরের রঙ কখন যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পালিয়ে গেছে- একমনে খুঁজেও পাচ্ছিলাম না তাকে- বেশ কিছুকাল পরে সে নিজেই এসে ধরা দিল।বর্ণান্ধ খামে ভরে- সেই রুলটানা কাগজঃ
“दे के दिल हम जो हो गए मजबूर
इस में क्या इख्त्यार है अपना
कुछ नही हम मिसाल-इ- उनका लेके
शहर- शहर इश्तहार है अपना।।
हय्रानी तो हुई होगी के कैसे तुमे खोज निकाले हम
पता है दुनिया में बे-ईमान और भी है
हर पता की कोई तो निशानी होती है
हर वफ़ा का बेहिसाब और भी है...”
(দেকে দিল হম জো হো গয়ে মজবুর
ইস মেঁ কেয়া ইখতিয়ার হ্যায় অপনা
কুছ নহী হম মিসাল-এ-উনকা লেকে
শহর- শহর ইস্তহার হ্যায়া অপনা।।)
(হ্যায়রানী তো হুই হোগী কে ক্যায়সে তুমে খোজ নিকালে হম
পতা হ্যায় দুনিয়া মে বে-ইমান ঔর ভী হ্যায়
হর পতা কী কোই তো নিশানী হোতী হ্যায়
হর বফা কা বেহিসাব ঔর ভী হ্যায়)
হাতের লেখাটা ততদিনে বড়ই পরিচিত হয়ে গেছে! শেষ লেখাটা চোখের উপর ভাসতো- ছট ফট করলাম কটা দিন- ভালো করে জানাই হয় নি মেয়েটাকে- তার আগেই...
কিন্তু কদ্দিন আর অনির্বচনীয়র আনন্দে উত্তাপহীন মাতোয়ারা হওয়া যায়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ভুলে গেলাম- বা বলা যেতে পারে চাপা পড়ে গেল অনিতা, অনিতা স্রফ। জীবন আমায় আবার দোলাতে দোলাতে নিজের পথে মোহাবিষ্টের মতো টেনে নিয়ে গেল।
এখন যেমন চলেছি-খানা খন্দ পেরিয়ে- ছাগল- ভেড়ার গন্ধ নিয়ে- রংচঙে কৃত্রিম কলসির দোলা খেতে খেতে। আকাশ এখন আমায় দেখে হাসছে। হাসুক- উপাদান দিয়েছি তাকে আনন্দের, এটাই আমার সবথেকে বড় পাওয়া। সবসময় অন্যদের খুশী করার জন্য বেঁচেছি সেটা ক্ষুদ্র স্বার্থর উপর হয়তো- কিন্তু প্রকৃতিকে আনন্দ দেবার মধ্যে একটা মহাজাগতিক অনুভব লুকিয়ে আছে- কাল থেকে সেটা টের পাচ্ছি- পরিবর্তনটা কি খালি কাউকে জানার আনন্দ, চেনার আনন্দ নাকি না পাওয়া না চাওয়ার মধ্যেও স্বর্গীয় আলোড়ন লুকিয়ে থাকে?
পথ অনেকটাই- চড়াই উতরাই, জঙ্গল শহর, গ্রাম মাঠ সবই চিত্রকল্পের মত চোখের সামনে দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে- কত রকম মানুষ, কতরকম সাজপোষাক-জঙ্গলের আদিবাসী- গ্রামের গরীব শহরের খেটে খাওয়া মানুষ- ভেড়া ছাগল সব মিলিয়ে বাসটা পেটমোটা টিফিন বক্সের মত দুলে দুলে চলেছে। শক এবসর্ভার লাগানো সেডান বা হাওয়াই জাহাজে চড়ে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে- দুলুনিটাই আর অনুভব করতে পারি না। কিন্তু এই ঝাঁকুনিটা মন্দ লাগছে না- যেন বাসটা বারে বারে বলছে থিতু হতে যেও না- তাহলেই বিপদ।
এতটা পথের একটা শারিরীক ক্লান্তি আছেই কিন্তু মন ফুরফুর করছে। ও হ্যাঁ, আরেকটা কাজ করেছি- আমার বহুমুখী ক্যামেরাটাকে ক্যুরিয়র করে আমার ক্যামেরাওলার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি- এই বলে- কিছু গলদ আছে, কিন্তু এক্ষুনি যেন না খোলে- আমি গিয়ে কথা বলে নেব।
গলদটা তো আসলে মনে- ভুলে গেছিলাম- রকমারি বাক্সে যে ছবি জমা রাখা যায় মন তার থেকে অনেক শক্তিশালী ইনবক্স। আর চোখের ১৬০০ মেগাপিক্সেলের লেন্স দিয়ে যে ছবি তোলা হবে তার ধারে কাছে থাকবে না ওই মেক আপ বক্সের আয়তনের ক্যামেরার মনে রাখা ছবির কোয়ালিটি। তার চেয়ে এই বেশ আছি...
অনিতার কথাও তো সেইরকমই ছিল। মনের চোখটা খোলো-মন কি আঁখে-আর পৃথিবীকে সেই অপার্থিব চোখ দিয়ে দেখার আনন্দটা তারিয়ে তারিয়ে অনুভব কর- ওই যে বাচ্চাটা প্রথমবারের জন্য বাসে চড়েছে- দুচোখে তার অপার বিস্ময়। পিছনের দিকের সিটে এক আধ বুড়ো বসে আছে- শরীর ভেঙেছে, কিন্তু মন? চোখ দেখে মনে হয় এখনো বছর ২০ টেনে দেবার ক্ষমতা রয়েছে ওই একদা সুঠাম শরীরে।
কিন্তু আমরা? মানসিক বয়স যে জোয়াল টানতে টানতে দিগন্তের দিকে ঢলে পড়েছে- বিলাস বহুল জিম আর সউনা বাথের শরীর চর্চাও বাঁচাতে পারবে বলে মনে হয় না- প্রকৃতি দুহাত ভরে দিয়েছে যেমন ধীরে ধীরে নিয়েও নিচ্ছে- যদি না প্রকৃতির বুকে নিঃশর্তে ফিরতে পারি।
গত পাঁচ বছর ধরে কত রকম ভাবে অনিতাও সেই কথা বলেছে- আমি আমার মতো করে “হুঁ, হাঁ” করে গেছি- আর মনে মনে বলে গেছি “ ঘানি তো আর টানলে না- বুঝবে কি করে?” এখন বুঝতে পারছি অনিতা কতটা সত্যি কথা বলতো-দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, পিছুটান না রাখা, সব যোগ হয়েছিল এই ফিলোজফির সঙ্গে।

অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়


                    অস্পৃশ্যনামা






শূদ্রগণ বড়ো অস্পৃশ্য। মাছ মারে বলে ধীবর ও কৈবর্তের জল অস্পৃশ্য, কিন্তু তাদের হাতের জলটুকু পান করলে যাদের জাত মারা যায়, তাদের কাছে পরম উপাদেয় আহার। শুঁড়ির হাতে মদ্য পান করলে জাত যায় না, তবে জল পান করলে জাত যায়। হাড়ি শূয়োর পালন করে বলে অস্পৃশ্য, কিন্তু হিন্দু রাজপুতেরা অনেক ক্ষেত্রেই শূয়োর ভক্ষণ করেও উচ্চশ্রেণির। নমঃশূদ্রের হাতের জল অচল, কিন্তু কারিগর কারা জেনেও বিরিয়ানি গপগপ করে খেতে কোনো প্রশ্ন ওঠে না।সোমরস পানের জন্য ব্রাহ্মণগণের তো শূদ্রই একমাত্র অবলম্বন ছিল, অবশ্য তার বিনিময়ে একটি বাছুর দেওয়া হত ; সোমরস দিয়ে শূদ্র কিছুদূর যাওয়ার পর পথিমধ্যে সেই দেওয়া বাছুর কেড়ে নেওয়া হত শূ্দ্রের গালে চড় মেরে।
এই হল ভারতের সামাজিক ভিত। শূদ্রদের অপমানের উপর যে সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে শূদ্রদের কতটা মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে পারলাম। ন্যূনতম সদিচ্ছা আছে কী ? সংবিধান রচনার সময় বলা হয়েছিল আগামী ১০ বছরের মধ্যে শূদ্রের হৃত সন্মান ফিরিয়ে দিতে হবে। চাকরির ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ দিয়ে তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতির মানুষদের সমান উচ্চতায় আনা হবে। কিস্যু হয়নি। ১৫ বছরে তো হয়ইনি, ৭০ বছরেও হয়নি। হয়নি, কারণ সংরক্ষণের নামে ওদের নিয়ে কেবলই নোংরা রাজনীতি হয়েছে। তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতির মানুষগুলো রাজনীতির বোড়ে। এই বোড়ে চেলে উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী যেমন মুখ্যমন্ত্রী হয়, বিহারে লালু-নিতীশরা মুখ্যমন্ত্রী হয়।তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতির মানুষদের কিছু হয় না। এই সংরক্ষণের সুবিধা প্রকৃতই যাদের প্রয়োজন তারা অধরাই থেকে যায়, ক্রিমি লেয়ারে অবস্থিত তফসিলি জাতির মানুষ তেলে মাথায় তেল পায়। এক প্রকৃত দরিদ্র মেধাবী ছাত্রীকে নিয়ে বিডিও অফিসে গিয়েছিলাম শিডিউল কাস্ট সার্টিফিকেটের জন্য। সেখানকার অফিসার জানালেন এমন কোনো দলিল দেখাতে হবে যাতে প্রমাণ হবে যে সে ৫০ বছর আগেও শিডিউল কাস্ট ছিল। না, দেখানো যায়নি। কারণ তারা এতটাই গরিব ছিল যে কোনো সম্পত্তি-সম্পদ তাদের ছিল না। তাই প্রমাণ করাও গেল না যে সে তফসিলি উপজাতি। সে ছিল জাতিতে বাগদি। বাগদি কি উচ্চবর্ণ ! আমি নিজ দায়িত্বে তাকে বিনা পয়সায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত টিউশন দিতে পেরেছিলাম, কিন্তু সংরক্ষণের সুযোগসুবিধা নেওয়াতে পারিনি। মেধা অকালেই ঝরে গেল !
সুষ্ঠুভাবে সমাজ, সংসার মায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে কর্ম-বিভাজন অত্যন্ত আবশ্যিক, বর্ণ-বিভাজন নয়। যাকে যে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হবে তাকেই সেই কাজ করতে হবে। যে যেই কাজে দক্ষ সে সেই কাজ করবে, সেটাই স্বাভাবিক।মানবসমাজের প্রতিটি মানুষই হাতে হাত মিলিয়ে সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছেন এইভাবে। তাহলে কেন  শুধু দ্বিজরাই সর্বোচ্চ সন্মান পাবে, উচ্চাসনে উপবেশনের মর্যাদা পাবে – কেন সেই মর্যাদার অংশীদার শূদ্ররাও পাবে না ? কেন তাদের কীটাণুকীটের মতো ঘৃণা করা হবে ? মানুষ কেন মানুষকে ঘৃণা করবে শুধুমাত্র ‘নিচু কাজ’ করার জন্য।অফিস-আদালতে-বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে ‘এ গ্রুপ’ ‘বি গ্রুপ’ ‘সি গ্রুপ’ ‘ডি গ্রুপ’-এর কর্মচারীরা বিভিন্ন কাজ করেন । সন্মান ও মর্যাদাও তাই ভিন্ন ভিন্ন। ‘এ গ্রুপ’ যেমন ব্রাহ্মণ বর্ণের মর্যাদা পায়, তেমনি শূদ্রের মর্যাদা পায় ডি গ্রুপের কর্মচারীরা। ডি গ্রুপের কাজ উপরের তিন গ্রুপের সেবা করা। এ গ্রুপের স্যরেরা নীচের দুটি গ্রুপের কর্মচারীদের কর্তৃত্ব করলেও তার সীমাবদ্ধতা আছে। ডি গ্রুপের কর্মচারীদেরকে দিয়ে সবরকম কাজ করিয়ে পারবে। জুতো পরিয়ে দেওয়া, বাজার করানো থেকে সবরকমের ফাইফরমাস করে খাটিয়ে নেওয়া যায়।ডি গ্রুপের মন চাইলে কর্মচারীকে কান ধরে উঠ-বোস করিয়ে দেওয়া হয়। উপরের তিন গ্রুপের বসার জন্য নির্দিষ্ট চেয়ার বরাদ্দ থাকলেও ডি গ্রুপের বসবার জন্য কোনো চেয়ার থাকে না।উপরের তিন গ্রুপের সামনে প্রায়-ক্রীতদাসের মতো দাঁড়িয়ে থাকে হয় পরবর্তী হুকুমের জন্য। ডি গ্রুপের কর্মচারীরা উপরের তিন গ্রুপের সামনের আসনে বসে পড়া বা বসে থাকা অভদ্রতা। সারা ভারতে তেমনটা নাহলেও পশ্চিমবঙ্গে সাতাত্তরে বামফ্রন্ট সরকারের শাসনকালে ডি গ্রুপের কর্মচারীদের শূদ্রত্ব কিছুটা কাটে। বসার চেয়ার-টেবিল হয়েছে, একটা সংগঠন হয়েছে অভাব-অভিযোগ জানানোর জন্য।মর্যাদা বৃদ্ধি হয়েছে কি ? না, হয়নি। আমি বেশ কয়েকটি অফিস-আদালতে গিয়ে দেখেছি উচ্চবর্ণের মানে সন্তানের বয়সি এ বি সি গ্রুপের কর্মচারীরা মা বা বাবার বয়সি ডি গ্রুপের কর্মচারীদের অবজ্ঞা-ভরা ‘তুমি’ সম্বোধন করে কথা বলেন, দুর্ব্যবহার করেন। এটা নিশ্চয় অসন্মানজনক।অফিস-আদালতেও বর্ণবাদ অত্যন্ত সক্রিয়।ডি গ্রুপের কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত পদদলিত হচ্ছে উপরের গ্রুপ কর্তৃক।
বৃহৎ শূদ্রসমাজকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের উপর শাসন ও শোষণের যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, তা আজও অব্যাহত। হিন্দুসমাজের অধিকাংশ মানুষ গভীর নিষ্ঠা সহকারে পালন করে স্বেচ্ছায় ব্রাহ্মণশ্রেণির খবরদারি ও শোষণের বলি হয়ে চলেছে।হিন্দুসমাজে বিভেদমূলক জাতিভেদ প্রথা ও পুজো-পার্বণের মধ্য দিয়ে চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক শোষণের ব্যবস্থা কর্তৃক সৃষ্ট হয়েছে।ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩.৫ ব্রাহ্মণগণ এখনও রীতিমতোভাবে শূদ্রদের ভীরুতার সুযোগ নিয়ে শাসন ও শোষণ করে চলেছে। তাই শূদ্রদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে তারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে।কারণ কাদা দিয়ে যেমন কাদা পরিষ্কার করা যায় না, তেমনি বুদ্ধিজীবী শোষকশ্রেণির নেতৃত্বে কখনও শোষণের অবসান ঘটানো গেল না।শোষণকে উচ্ছেদ করতে হলে প্রয়োজন শোষিত উৎপাদক শ্রেণির নেতৃত্ব।ডঃ আম্বেদকরের মতে, ‘জাতব্যবস্থার বিলুপ্তি’ ঘটাতে পারলেই আসবে শ্রেণি-সংগ্রাম।যারা জাতকে বহাল রেখে শ্রেণি-সংগ্রামের কথা বলছেন তারা শ্রমজীবী মানুষদের ধোঁকা দিচ্ছে।জগজীবন রাম বলেছেন – “Any movement for social equality must be anti-Brahmin in character.” অর্থাৎ সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যদি কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে হয় তবে তা হতে হবে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী।ডঃ আম্বেদকরের ভাষায় – “The Brahmin is always opposed to change. For, to him change means loss of power and loss of pelf.” অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতি সর্বদা পরিবর্তনের বিরোধী। কারণ তাদের কাছে পরিবর্তনের অর্থ হল প্রভাব ও সম্পদলাভের সমূহ ক্ষতি।
ভারতে ব্রিটিশ মুক্তির পর বাবা সাহেবের তত্ত্বাবধানে তফসিলিদের জন্য যে সংরক্ষণ চালু হল, সেটার যথাযথ প্রয়োগ হল কি ? না, প্রয়োগ হয়নি। চাকুরিতে কোটা হয়েছে, শিক্ষা ইত্যাদিতেও কোটা হয়েছে। কারা পাচ্ছেন এইসব সুবিধা ? যাদের দারিদ্রতা থেকে মুক্তি হয়নি তারা পেল কি ? আলোকিত মানুষরা আরও বেশি করে আলোকিত হল বটে, যে বৃহৎ অংশ আঁধারে ছিল, তারা আঁধারেই আছে। উল্টে সংরক্ষণ ভোগীরা সমাজে বিদ্রুপের পাত্র হয়ে গেলেন। সংরক্ষণ কোটায় চাকরি বা শিক্ষায় যারা প্রবেশাধিকার পায়, রকে অন্যরা করুণার চোখে দেখে, তিরস্কৃত হয়। এই সংরক্ষণ আসলে সমাজকে বিভাজিত করে রাখল, একত্রিত করতে পারেনি। ব্রাহ্মণ্যবাদের এই সুচতুর কৌশলে ১০০ ভাগ ব্যর্থ হয়ে গেল বাবা সাহেবের স্বপ্ন।আজও, এখনও উচ্চবর্ণেরা মায় নিন্মবর্ণ পর্যন্ত কোনো চিকিৎসকের নামের পিছনে দাস-মণ্ডল-বিশ্বাস পদবি থাকলে তার কাছে চিকিৎসা করাতে দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করে। কম নম্বর পেয়েও বিশেষ কোটায় প্রাপ্ত চাকরি বা পেশায় যুক্ত ব্যক্তিকে অযোগ্য কম শিক্ষিত ভাববে এটা আর নতুন কী ! তাঁর জ্ঞান তাঁর দক্ষতা নিয়ে তো প্রশ্ন ওঠবেই।
হার্দিক পটেলের মামলায় গুজরাত হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি পর্দিওয়ালা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছিলেন। ওই মামলায় রায় গিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘দু’টি জিনিস দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বা বলা ভাল, দেশকে সঠিক পথে এগোতে দেয়নি। এক, সংরক্ষণ, দুই, দুর্নীতি।’ সংরক্ষণের বিরুদ্ধে ‘অসাংবিধানিক’ মন্তব্য করায় গুজরাত হাইকোর্টের এই বিচারপতিকে ‘ইমপিচ’ করা অর্থাৎ সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছিল সংসদে।যে ৫৮ জন সাংসদ চেয়ারম্যানকে দেওয়া পিটিশনে সই করেছেন, তাঁদের মধ্যে কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই, জেডি(ইউ), বিএসপি, ডিএমকে, এনসিপি — সব দলের সদস্যই রয়েছে। তবে তৃণমূলের কেউ ছিল না।কংগ্রেসের তরফে আনন্দ শর্মা, অশ্বিনীকুমার, অস্কার ফার্নান্ডেজ, অম্বিকা সোনি, বি কে হরিপ্রসাদ, সিপিআই-এর ডি রাজা, সিপিএমের কে এন বালগোপাল, জেডি(ইউ)-র শরদ যাদবরা ওই পিটিশনে সই করেছিলেন।গুজরাতের বিচারপতির বিরুদ্ধে পিটিশনে বলা হয়েছে— বিচারপতি পর্দিওয়ালা হার্দিক পটেলের মামলার রায়ে বলেন, “যখন সংবিধান তৈরি হয়েছিল, এটা ধরে নেওয়া হয়েছিল যে দশ বছরের জন্য সংরক্ষণ প্রথা বজায় থাকবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরেও সংরক্ষণ চলছে।” সাংসদের যুক্তি, “সংবিধানে দশ বছরের রাজনৈতিক সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। সেটি সংসদ বা বিধানসভায় তফসিলি জাতি-উপজাতির জন্য সংরক্ষণের বিষয়। তার সঙ্গে শিক্ষা বা চাকরিতে সংরক্ষণের সম্পর্ক নেই। একজন বিচারপতি যে তফসিলিভুক্ত মানুষের সংরক্ষণের বিষয়ে অবহিত নন, সেটা দুর্ভাগ্যজনক।”
তবে সংরক্ষণ শুধু রাজনৈতিক, চাকুরি আর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে ? সমাজে সাম্যতার প্রয়োজন নেই ? সমাজে সাম্যতার জন্য ভোট-রাজনীতিকরা কী কী প্রকল্প ভেবেছেন ? ভাবেননি, ভাবলে আজও দলিত শ্রেণির মানুষ অপমানিত হত না, নির্যাতিত হত না, লাঞ্ছিত হত না, ছোটোজাতের মানুষ হয়ে জীবন ধারণ করতে হত না। ভোট-রাজনীতি বা ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে উঠে এল কাঁসিরামের দলিত সম্প্রদায়, বহুজন সমাজ পার্টি বা বিএসপি। খুব সহজ ছিল না সেই যাত্রাপথ।ত্রয়োদশ লোকসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বড়ো চমক ছিল মায়াবতী এবং মুলায়ম সিং যাদব। প্রচারের আলো মুলায়মের উপর কিছুটা পড়লেও মায়াবতী অন্ধকারে। দলিত মায়াবতীকে পদে পদে হেয় এবং হাস্যাস্পদ করে বর্ণহিন্দুর সমাজ-রাজনীতি-গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সার্থক করতে চাইছিল। মিডিয়ার উপেক্ষা, উপেক্ষা আর অপেক্ষা। মায়াবতীকে ধর্তব্যের মধ্যেই রাখা হল না। বস্তুত কারোকে হেয় করার পক্ষে উপেক্ষার চেয়ে আর কোন্ অস্ত্র সর্বাধিক ধাঁরালো হতে পারে ! কিন্তু সেই অমোঘ উপেক্ষাকে অগ্রাহ্য করে মায়াবতী একাই ছুটলেন তাঁর রাজ্যের ৮৫টি লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিটি কোনায় কোনায়।রাস্তার ধুলো উড়িয়ে তাঁর মোটরগাড়ি এক সভাস্থল থেকে অন্য সভাস্থলে ছুটে গেছে । গোরুর গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো গাড়িতে চড়তে অনভ্যস্ত দলিতরা তাঁদের নেত্রীর এই মোটরগাড়ি চড়তে গর্বিত বোধ করেছে।“ভোট হামারা রাজ তুমহারা, নেহি চলেগা নেহি চলেগা” -- অবশেষে ব্রাহ্মণ্যবাদ তথা শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে এসে গেল দলিত শ্রেণির চোখ-ধাঁধানো সাফল্য।তিলতিল করে গড়ে তোলা নিজেদের গণভিত্তি ধরে রাখতে পেরেছিলেন তাঁরা। তৎসহ তাঁদের বার্তা সম্প্রসারিত করতে পেরেছিলেন নতুন নতুন জনগোষ্ঠীর মধ্যে।দলিত মায়াবতী অত্যন্ত নিপুণ চাতুর্যের সঙ্গে পাটিগণিতের মিশেল ঘটিয়ে ক্ষমতার অলিন্দে চলে এলেন, সদলবলে। বর্ণহিন্দুদের আধিপত্য খর্ব হল, দলিত শ্রেণির ক্ষমতায়ন হল।এখন প্রশ্ন – শুধুমাত্র দলিতের ভোটেই ক্ষমতার অলিন্দে আসা সম্ভব ? না, নিশ্চয়ই সম্ভব নয়।যে পার্টি শুধুমাত্র দলিতদের জন্য, সেই দলকে অন্যেরা ভোট দেবে কেন? দেবে, কারণ রাজ্যের জনবিন্যাসের কাঠামোয় সম্প্রদায় ও জাতের অনুপাত অনুযায়ী তিনি ৩৮ শতাংশ অনগ্রসর, ২০ শতাংশ দলিত, ১৭ শতাংশ মুসলিম এবং ১০ শতাংশ উচ্চবর্ণীয় প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছিলেন। প্রজাতন্ত্রের সমগ্র ইতিহাসে যেসব ‘ছোটোজাত’ ‘অস্পৃশ্য’ বুথের ধারেকাছে ঘেঁষতে দিত না, সেই ছোটোজাতরাই লোকসভা অলংকৃত এবং আলোকিত করে রাখলেন।
এতদসত্ত্বেও মায়াবতীর কার্যকলাপে দলিতরা শেষপর্যন্ত অনাস্থা জ্ঞাপন করলেন।কারণ মায়াবতীরা সুশাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি। নন্দিত নয়, নিন্দিত হলেন দেশজুড়ে। কারণ ক্ষমতার গোলকধাঁধায় মায়াবতীরাও ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিলিপি হয়ে উঠলেন। ক্রমে ক্রমে মায়াবতীও ‘দেবী’ হলেন, মানে ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুকরণে ‘ঈশ্বর’ হয়ে গেলেন। রাজ্যের দিকে দিকে ‘ভগবান’ মায়াবতীর মূর্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। জাস্ট ব্রাহ্মণ্যবাদের অন্ধ অনুসরণ করলে শাসনের নতুন ধারা পেলেন কি দলিতরা ? ভাবলে অবাক লাগে উত্তরপ্রদেশের দলিত শ্রেণি থেকে উঠে আসা ধনী মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী যখন দলিতদের জন্য কোনো মঙ্গলই করতে পারেন না। উল্টে আইপিএস অফিসারকে দিয়ে নিজের জুতো পরিষ্কার করান, মাথার উপর এসি নিয়ে মিটিং-মিছিল করান ইত্যাদি। আহা, মর্যাদার কী অপচয় ! অথচ কাঁসিরামের বহুজন সমাজ পার্টি এই উত্তরপ্রদেশেই যখন শাসনক্ষমতার অংশীদার হন তখন সর্বজনীন ভোটাধিকারের সুযোগ সদ্ব্যবহার করে দলিত-অনুসূচিতরাও যে ক্ষমতা দখল করতে পারে তা কাঁসিরাম হাতেকলমে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।দেশব্যাপী নিন্মবর্গীয় সমাজের গ্লানি ও হীনম্মন্যতা যেমন অনেকাংশে কেটেছে, উজ্জীবিত করেছে।দলিত শ্রেণি তো শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই নেই, ভারতের সমস্ত রাজ্যেই তারা বিপুল সংখ্যায় আছেন – তা সত্ত্বেও কাঁসিরামের দল ‘বহুজন সমাজ পার্টি’ অন্য কোনো রাজ্যে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেননি। শূদ্র জাগরণ দূর-অস্ত ? ভোটে রাজনীতিতে জাগরণ না-হলেও সামাজিক জাগরণে বাধা কোথায় ?
বাবাসাহেব আম্বেদকর থেকে জগজীবন রাম, মায়াবতী থেকে শিবু সোরেন – সকলেই হয় জাতীয় কংগ্রেস, না-হয় বিজেপির খপ্পরে গ্রাসিত হয়েছেন। ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের যিনি ঝড়-বৃষ্টি-অগ্নি, সেই দলিত শিবু সোরেন পর্যুদস্ত হলেন জাতীয় রাজনীতিকদের ষড়যন্ত্রে। কেন্দ্রের ইউপিএ জোট সরকারের তিন শরিক দল - জেএমএম, কংগ্রেস ও আরজেডি'র কোয়ালিশন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শিবু সোরেন৷ শিবু সোরেন আগে ছিলেন কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রী৷ অবশেষে শিবু সোরেনও বর্ণহিন্দুদের ফাঁদে শরীর ডোবালেন। দুর্নীতি ও খুনের মামলায় তাঁকে পদত্যাগ করতে হল৷ বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন৷ ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার জোট সরকারে ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে এমন বিধায়কের সংখ্যা ৩১। এদের নিয়েই নতুন ঝাড়খণ্ড সরকার গড়বেন দলিত শিবু সোরেন। সে কথা ঘোষণা করতে এসে বড়ো মুখে বললেন দুর্নীতিমুক্ত সরকার জনসাধারণকে উপহার দেওয়াই তার লক্ষ্য।ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নিজেরই ১৮ জন বিধায়কের মধ্যে ১৭ জন, দাগি আসামি হিসাবে পুলিশের খাতায় জ্বলজ্বল করছে। একমাত্র ক্রিমিনাল রেকর্ডহীন বিধায়ক শিবু সোরেনের পুত্রবধূ প্রয়াত দুর্গা সোরেনের স্ত্রী সিতা সোরেন। শিবুর বিধায়কদের মধ্যে সর্বোচ্চ অপরাধের অভিযোগটি আছে জগন্নাথ মাহাতোর নামে। তার নামে দায়ের করা আছে ১৪টি অপরাধ। শিবুর ছেলে হেমন্ত সোরেনের নামে আছে ৬ টি অপরাধের অভিযোগ। জে.এম.এম ছাড়াও জোট সঙ্গীদের মধ্যে আছেন বাকি ১৪ জন বিধায়ক, যারা নরহত্যা সহ বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত।
শিবু সোরেনও দলিতদের নিয়ে ঝাড়খণ্ড বানালেন, মুখ্যমন্ত্রী হলেন। ব্রাহ্মণ্যবাদের অন্ধ অনুসরণ করলেন এবং পুনরায় পতিত হলেন। ঝাড়খণ্ড এবং শিবু সোরেন আদিবাসী চেতনায় একটি সমার্থক শব্দ হওয়া সত্ত্বে পতন হল। বর্ণবাদের বিষ বড়োই ভয়ানক। শিবু সোরেনরা কখনোই অরণ্যের অধিকার, মাটির অধিকার, জলের অধিকার, আকাশের অধিকার, বাতাসের অধিকার অর্জন করতে পাবে না ? ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের মসৃণ অগ্রগতির পথ থেকে ‘অস্পৃশ্যদের’ সরে যেতেই হবে ! ষড়যন্ত্র আর প্রতারণার শিকার হবে ! শম্বুক, একলব্যরা কি চিরকাল হননযোগ্য হয়েই থাকবে ?
এমন ঘৃণা আর অস্পৃশ্যতা আদিকাল থেকেই ছিল ! উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থ ‘জাতের বিড়ম্বনা’-য় বলছেন – না। বলছেন – “স্মৃতিশাস্ত্রকে এখন রান্নাঘরের হাঁড়িকুঁড়ির শাস্ত্র বলিলেই চলে। রন্ধনটা যে ব্রাহ্মণের একটা বিশেষ কার্য্য একথা সেকালের ধর্ম্মশাস্ত্রকারেরা লিখিতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। আমাদের একালের পণ্ডিত মহাশয়েরা সে ভুলটা সংশোধন করিয়া লইয়াছেন। এখন ‘বামুন ঠাকুর, অর্থে রাঁধুনি। আজকাল ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য জাতের ভাত খাইলে আমাদের ঠাকুর মহাশয়দের এক তাল গোবর খাইয়া সে ভাত হজম করিতে হয়।কিন্তু সেকালে ব্রাহ্মণদের এতটা অজীর্ণ হয় নাই। ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যের অন্নের ত কথাই নাই; অনেক শূদ্রের হাতের ভাতও তাঁহারা নির্ব্বিবাদে হজম করিতেন। তাঁহাদের জাতটি যে তাহাতে মারা যাইত, এরূপ কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। আজকাল আহার বিষয়ে যিনি যত বড়ো “ছুৎমার্গী”, তিনি তত বড়ো পণ্ডিত।”
কিন্তু কী আশ্চর্য ! অস্পৃশ্যের অজুহাতে যে ঘৃণা যে প্রকার উচ্চবর্ণেরা করে থাকে তা মূল শাস্ত্রীয় বিধিতে পাওয়া যায় না। লৌকিক যুক্তিও নেই।যা আজকাল চল আছে তা হল অহংকারপ্রসূত দেশাচারমাত্র।শাস্ত্রে যা নির্দেশ আছে তা নিশ্চয় কার্যকর হয় না। কারণ মাছ মরে বলে ধীবর বা জেলে ও কৈবর্তের জল অস্পৃশ্য।  তাদের হাতে জল পান করলে জাত মারা যায় বটে।কিন্তু তাদের ধরা মাছ খেলে জাত যায় না, পরম উপাদেয় আহার। শুঁড়ির হাতে চোলাই খেলে জাত যায় না, জল পান করলে জাত যায় যে ! হাড়ি বা মেথর শুয়োর ভক্ষণ করে বলে তারা অস্পৃশ্য, রাজপুতেরা অনেকক্ষেত্রে শুয়োর ভক্ষণ করলেও তারা উচ্চবর্ণ হিন্দু। মুচি বা ঢুলি বা চর্মশিল্পী গোরু-ছাগলের ছাল ছাড়ায় বলে তারা খুবই ঘৃণ্য, কিন্তু তাদের তৈরি তবলা-ঢোলক ব্যবহার করলে ঘৃণ্য হই না, টিউবওয়েলে গোরুর চামড়ার ওয়াশার ধোয়া জল খেলে জাত যায় না।নমঃশূদ্রের জল অচল --  মুসলমানের বরফ, ডাবের জল, খাসির মাংস, বিরিয়ানি খেলে জাত যায় না।যদিও একটা পর্যায়ে মুসলমানরাও ভয়ানক অচ্ছুৎ।আসলে হিন্দুসমাজের চোখে মুসলমানেরাও তো দলিত শ্রেণিই।দলিত খ্রিস্টান কিংবা দলিত মুসলিমদের ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী বলে মনে হতে পারে। ভারতে মতো দেশে দলিতরাই প্রধানত খ্রিস্টান বা ইসলাম ধর্মে অন্তরিত হয়েছেন।অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদপীড়িত হিন্দুসমাজের নিম্নবর্গীয় জনসমাজই সাম্য ও সৌভ্রাত্র্যের আকর্ষণে একদিন হিন্দুধর্ম ছেড়ে ইসলামকে বরণ করেছিলেন। বরং বলা ভালো – হিন্দুধর্মে তাঁরা কখনোই সেভাবে আঁকড়ে ধরার সুযোগই পাননি, ধর্মধ্বজাধারীরা ও সমাজপতিরা কাঁটাতারের ওপারেই রেখে দিয়েছিলেন।দলিত হিন্দুরাই যে ধর্মান্তরিত হয়ে ভারতীয় মুসলমান কিংবা খ্রিস্টান হয়েছেন, এটা ঐতিহাসিক সত্য।যেহেতু সেই দলিতই আজকের মুসলিম, তাই মুসলমানও অস্পৃশ্য। কিন্তু দলিত হয়েও ভারতীয় খ্রিস্টানরা কী আদরনীয়। ২৫ ডিসেম্বর বড়োদিন এবং ফার্স্ট জানুয়ারি হিন্দুদের উল্লাসে কোনো খামতি দেখি না।ঘরে ঘরে সান্তাক্লজ এসে মোজায় উপহার দিয়ে যাওয়ার নিয়ম পালন করে, কেক খান।কিন্তু ইদের দিনে কোনো হিন্দুকে দেখিনি বিরিয়ানি-ফিরনি খেতে।ডাবল স্টান্ডার্ড মানসিকতা কেন ? মর্মান্তিক হলেও সত্য, ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও ভরতীয় দলিত ও জনজাতীয়রা আগের মতো প্রান্তিক হয়ে থেকে গেছেন। নতুন সম্প্রদায় হয়েও জাতে উঠতে পারল না ভারতীয় সমাজে।
জাতপাত ব্যবস্থা বর্ণগত মই বাহিত হয়ে নিচে নেমে যায় এবং কখনোই পুরোপুরি অদৃশ্য না-হওয়ায় আম্বেদকরের বর্ণিত ‘অনুকরণের সংক্রমণ’ প্রতিটি বর্ণেরই ক্রমপরম্পরায় নিম্নতর বর্ণের উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা হয়।তেজস্ক্রিয় অণুর অর্ধেক জীবনের মতো ‘অনুকরণের সংক্রমণ’ গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নষ্ট করে দেয়। এর ফলে এমন এক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে যেটাকে আম্বেদকর বলেছেন ‘ক্রমবিন্যস্থ বৈষম্য’। এতে আরও নিচুর তুলনায় নিচু বর্ণও বিশেষ অধিকার ভোগের অবস্থানে থাকে। প্রতিটি বর্ণই বিশেষ অধিকার ভোগ করে, প্রতিটি শ্রেণিই ব্যবস্থাটি বজায় রাখার ব্যাপারে আগ্রহী।আমাদের সমাজে পচনের মূলেই আছে এই জাতপাত প্রথা। অধস্তন জাতের প্রতি যা কিছু করা হয়েছে, তা তো আছেই, সেইসঙ্গে এটা বিশেষ অধিকারভোগকারী বর্ণের নৈতিকতার মূলে পচন ধরিয়েছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর মতে, প্রতি ১৬ মিনিটে একজন দলিতের সঙ্গে আর-একজন অদলিত অপরাধ করে, প্রতিদিন ৪ জনেরও বেশি অস্পৃশ্য নারী স্পৃশ্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়। প্রতি সপ্তাহে ১১ জন দলিত খুন হয় এবং ৬ জন দলিত অপহৃত হয়। শুধুমাত্র ২০১২ সালেই ২৩ বছর বয়েসের ১ জন নারী দিল্লিতে গণধর্ষণের শিকার হয়, ১৫৭৪ জন দলিত নারী ধর্ষিত হয় (বৃদ্ধাঙ্গুলির শাসানির জোরে দলিতদের সঙ্গে ঘটা ধর্ষণ বা অন্যান্য অপরাধের মাত্র ১০ ভাগ প্রকাশিত হয়) এবং ৬৫১ জন দলিতকে হত্যা করা হয়। এগুলি ছিল ধর্ষণ ও বর্বরতা, যা লুণ্ঠন আর নগ্ন হতে বাধ্য করাই নয়, জোরপূর্বক মানুষের মল খাওয়ানো, জমি দখল,সমাজচ্যুত করা, খাওয়ার জল আনতে বাঁধা দেওয়া। এ পরিসংখ্যানে পাঞ্জাবের বান্ত সিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি, যিনি ছিলেন একজন মাজহাবি দলিত শিখ। ২০০৫ সালে যার দুই হাত এবং একটি পা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে দেওয়া হয়। কারণ সে তার মেয়েকে গণধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। তিনটি অঙ্গ ছেদ হওয়া ব্যক্তির জন্য আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই।কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে --
ঘটনা – ১ : ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর। মধ্যপ্রদেশ। তার খেতে ঢুকে ফসল খেয়ে নিচ্ছিল গরুর দল। গোরুর মালিককে এ ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে গিয়ে চরম লাঞ্ছনার শিকার হতে হল এক দলিত নারীকে। তাকে নগ্ন করে মারধরের পর প্রস্রাব খেতেও বাধ্য করা হয়। ছত্তরপুর জেলায় এই নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় থানার নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছিল। ওই মহিলাকে নিয়ে দলিত সম্প্রদায়ের কয়েকজন জেলার সহকারী পুলিশ সুপার নিরজ পান্ডের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় নওগং থানা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।নিগৃহীতার অভিযোগ, বিজয় যাদবের বাড়িতে গিয়ে তার খেতে গওরু ঢোকার বিষয়টি জানান। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে বিজয় ও তার স্ত্রী বিমলা তাকে মারধর করেন। এমনকি জামাকাপড় খুলে তাকে প্রস্রাব খেতেও বাধ্য করা হয়।
ঘটনা – ২ : ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর।উত্তরপ্রদেশ। এক দলিত পরিবারের পুরুষ ও নারীদের প্রকাশ্যে নগ্ন করে পেটাল পুলিশ।  সন্তান ও লোকজনের সামনে এই দম্পতিকে গণনগ্ন করার ঘটনা ঘটল। বুদ্ধনগর জেলার ধানকুড় থানায় এই ঘটনা ঘটে। স্থানটি ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ঘটনার দিন ধানকুড় থানায় একটি ডাকাতির মামলা করতে যান সুনীল গৌতম নামে একজন দলিত পুরুষ। পুলিশ ওই মামলা না-নিয়ে স্ত্রীসহ সুনীলকে বাজারে রাস্তার মধ্যে কাপড় খুলে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখে। এরপর নগ্ন দম্পতিকে পেটায়।
এ ঘটনার পর স্থানীয় এক সাংবাদিক পুরো ঘটনাটির একটি ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ পোশাক পরা এক ব্যক্তি রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ওই দম্পতির কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। আর পাশেই দাঁড়িয়ে ঘটনাটি দেখছে পুলিশের পোশাক পরা এক ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর সেই পুলিশও মারধরে অংশ নেয়। ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত দুজনকে পুলিশ বলে চিহ্নিত করেছেন ওই দলিত দম্পতি।
ঘটনা – ৩ : ২০১৫ সালের ১৯ মে। উত্তরপ্রদেশ। শাহজানপুর জেলার জালালাবাদের কাছে একটি গ্রামের অন্তত পাঁচজন দলিত মহিলা অভিযোগ করেছেন, তাদের চেয়ে তুলনায় উঁচু জাতের কাশ্যপ সমাজের অন্তত পনেরো জন নারীপুরুষ সেদিন সকালে তাদের উপর চড়াও হয়। তারপর তাদের কাপড়চোপড় খুলে নিয়ে রাস্তা দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় তাদের বেত দিয়ে পিটনো হয়। বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এই নির্যাতন। দলিত সমাজের একটি ছেলে কাশ্যপদের একটি নাবালিকা মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে তাদের উপর এই নির্যাতন চালানো হয়।  ওই মেয়েটির মা এবং অন্য আত্মীয়রা এসে ছেলেটির মা-নানি-চাচিদের উপর হামলা চালান। তাদের মারধর করা হয়, শাড়ি ও কাপড়চোপড় খুলে নেওয়া হয়।  এসময় হামলাকারীরা বলতে থাকেন- “আমাদের সম্মান যারা নষ্ট করেছে তাদের আবার ঘোমটা কীসের, তাদেরকেও আমরা ইজ্জত রাখতে দেব না।” ঘটনার তদন্তে যে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন তারা এসে রিপোর্ট দিয়েছেন দলিত মহিলাদের অবশ্যই নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছিল। এসময় প্রশাসনও প্রথমে নির্বিকার ছিল। তবে জানা গেছে দলিতদের বে-ইজ্জতি করার জন্য কাশ্যপ সমাজের মোট দশজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও তিনজন মহিলাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও তিনজন পলাতক মহিলাকে ধরার জন্য বিশেষ দলও গঠন করা হয়েছে।
ঘটনা – ৪ : ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি। মহারাষ্ট্র। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী পৃথ্বিরাজ চ্যাবনের নিজ জেলায়ই এক মহিলাকে নগ্ন করে রাস্তায় ঘোরানো হয়েছে। এ ঘটনার আগে ৪৫ বছর বয়সি ওই নারীকে একদল মানুষ প্রহার করে। এসব ঘটনার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দলিত শ্রেণির ওই মহিলা এখন বিচার চাইছেন সবার কাছে। কিন্তু তিনি দলিত শ্রেণির বলে তার অভিযোগ নিবন্ধিত করতে বিলম্ব করা হয়। অভিযোগ আছে, ওই ঘটনায় জড়িতরা মুখ্যমন্ত্রীর খুব কাছের বলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে বিলম্ব করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না।২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর উচ্চবংশীয় এক যুবতীকে নিয়ে পালিয়ে যায় নির্যাতিত ওই দলিত মহিলার ছেলে। এরপর ওই যুবতীর অভিভাবকরা তাদের মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে মর্মে একটি অভিযোগ দাখিল করে। একই সঙ্গে তারা ওই মহিলাকে তাদের মেয়ে বের করে দিতে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে।ওই সময় তিনি জানিয়ে দেন তার ছেলে ও ওই মেয়ে পালিয়ে কোথায় গেছে তা তিনি জানেন না। নিখোঁজ যুবতীর পরিবার  একটি স্থানে ডেকে নেয় দলিত শ্রেণির ওই মহিলাকে। এরপর তাকে প্রশ্নবাণে তারা জর্জরিত করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা তাকে ধমকাতে থাকে, প্রহার করতে থাকে, এমনকি তাকে নগ্ন করে গ্রাম ঘুরতে বাধ্য করে। এ ঘটনায় ওই মহিলা মারাত্মক আহত হন। তাকে পরের দিন একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দলিত মহাসংঘ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাচিন্দ্র সাকাতে বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রীর নিজের জেলায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ চোখ বন্ধ করে আছে। তারা রাজনৈতিক কারণে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”
ঘটনা – ৫ : ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি। পশ্চিমবঙ্গ। কুড়ি বছরের এক আদিবাসী তরুণীকে ১২ জন ব্যক্তি গণধর্ষণ করেছে  বীরভূম জেলায়। গ্রামে সালিশী সভায় ওই তরুণীকে ‘অপরাধী’ বলে চিহ্নিত করে গণধর্ষণের শাস্তি দেওয়া হয়।ওই মেয়েটির ‘অপরাধ’ অনাদিবাসী একটি ছেলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল গত পাঁচ বছর ধরে। গ্রামের মোড়ল ও ধর্ষণকারী সহ মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।বীরভূমের পুলিশ প্রধান সি সুধাকর জানিয়েছেন, “সোমবার রাতে রাজারামপুর গ্রামে সালিশী সভায় ওই গণধর্ষণের নির্দেশ দেন গ্রামের মোড়ল বলাই মান্ডি। অভিযোগে বলা হয়েছে, চৌহাট্টা গ্রামের এক অনাদিবাসী ছেলের সঙ্গে অত্যাচারিতা ওই মেয়েটির প্রেমের সম্পর্ক জানাজানি হয় ।সেদিনই সালিশী সভায় দুজনকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করা হয় আর ২৫০০০ টাকা করে জরিমানা ধার্য করা হয়। যুবকের পরিবার টাকা মিটিয়ে দিতে পারলেও ওই তরুণীর পরিবার তাদের আর্থিক অবস্থার কথা জানিয়ে টাকা দিতে পারবে না বলে জানায় গ্রামের প্রধানদের।তখনই মোড়ল বলাই মান্ডি বলে “যাও, ওকে নিয়ে মজা করো"। পরপর ১২ জন ধর্ষণ করে তরুণীটিকে, যাদের মধ্যে মেয়েটির বাবার বয়সি লোকও ছিল, আবার তার ভাইয়ের বয়সি ছেলেও ছিল। প্রধান বলাই মান্ডি আবার ওই তরুণীর গ্রাম সম্পর্কে কাকা। ২০১০ সালে এক তরুণীকে নগ্ন করে গ্রামে ঘোরানো হয় এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কারণে।আদিবাসী সমাজে অনাদিবাসী কাউকে বিয়ে করলে সমাজচ্যুত করার চল রয়েছে। এ হল দলিত কর্তৃক দলিতের লাঞ্ছনা।
ঘটনা – ৬ : ২০১৫ সালের ২১ জুলাই। আসাম। ডাইনি সন্দেহে এক বৃদ্ধাকে নগ্ন করে শিরোশ্ছেদ করা হয়েছে। আসামের সোনিতপুর জেলায় আদিবাসীদের একটি গ্রামের এ ঘটনায় পুলিশ দুজন মহিলা সহ সাতজনকে আটক করেছে।পুলিশের স্থানীয় এক কর্মকর্তা সামাদ হুসেন বলেন, ওই গ্রামে গত কিছুদিন ধরে অসুখ-বিসুখ ছড়িয়ে পড়ছিল। এর জের ধরে গ্রামবাসীরা ৬৩ বছর বয়সি পুরনি ওরাংকে দায়ী করা শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা ওই বৃদ্ধাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে শিরোশ্ছেদ করে।প্রসঙ্গত, আসামে অনেক আদিবাসী সমাজে এবং চা শ্রমিকদের মধ্যে মহিলাদের ডাইনি হিসাবে সন্দেহ করার চল রয়েছে। গত বছর অক্টোবর মাসে দেবযানী বোরা নামে ভারতের জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটকে ডাইনি হিসাবে অভিযুক্ত তাকে বেদম মারধর করা হয়।রাজ্য পুলিশের দেওয়া হিসাবে, গত ছয় বছরে ডাইনি সন্দেহে আসামে ৯০ জনকে হয় মাথা কেটে নেওয়া হয়েছে অথবা  জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে।
২০০৫ সালে ৩১ আগস্ট হরিয়ানার গোহানায় বর্ণহিন্দুদের জনাকয়েক ক্ষমতাবান লোক দলিতদের একটি বস্তির ডজনখানেক বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।সরকার থেকে ঘোষণা করা হল পুড়ে যাওয়া বস্তির প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। কিন্তু অন্যায় কাজটি করল তাদের কী শাস্তি হল কেউ জানে না।হরিয়ানায় যখন দলিতদের বস্তি পুড়ে ‘রাখ’, ঠিক তখনই বিহারে রণবীর সেনাদের গুলিতে ঝাঁঝরা দলিত মানুষেরা। এ-রকম না-হলেও অন্য-রকম হতে বাধা কোথায় পশ্চিমবঙ্গে ! তমলুক শহরের পদুমপুর গ্রামের তফসিলিভুক্ত পরিবারগুলি মন্দিরে ঢুকতে পারে না।পঞ্চায়েতের সিপিএম সদস্য প্রভাস ধাড়া স্বীকার করেছেন, গ্রাম কমিটির নামে মোড়লদের দাপট এখানে এতটাই বেশি যে অনেকবার বৈঠক করেও তফসিলিদের মন্দিরে ঢোকার ব্যবস্থা যায়নি। ফলে তফসিলি পরিবারগুলি পুজো দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত।” এ-সময় রাজ্যের তখত-এ-তাউসে উপবিষ্ট কমঃ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
বর্ণহিন্দু মানে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণদের কথা বলা হয় না, বর্ণহিন্দু বলতে বোঝায় শূদ্র ছাড়া বাকি সকল দ্বিজজাতি। এখানে বিষয়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হল দলিতদের উপর শুধুমাত্র বর্ণহিন্দুরাই অচ্ছুৎ বা অস্পৃশ্য ভাবে বা নির্যাতন করে, তা বললে সত্যের অপলাপ হয়। ঘৃণা নিচু জাতের সঙ্গে নিচুজাতেরও কম নেই। স্তরে স্তরে ঘৃণা। সকলেই একে অপরের থেকে উঁচু জাত সেটাই প্রমাণ করতে চায়।হিন্দুসমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র – এই চারভাগে ভাগে ভাগ করেছে ব্রাহ্মণ্যবাদ। কিন্তু শূদ্ররা নিজেরাই বিভাজিত হয়ে আছেন হাজার ভাগে।মুচিরা মেথরদের ঘৃণা করেন, মেথররা ডোমদের ঘৃণা করেন, মণ্ডল মজুমদারদের ঘৃণা, হালদাররা প্রমাণিকদের ঘৃণা করেন, বিশ্বাসরা ঘৃণা করেন বাগদিদের  ইত্যাদি। অত্যাচার-নির্যাতনও চলে। একে অপরের সঙ্গে বিবাহ-শুভকার্যাদিও করেন না। উচ্চবর্ণে উন্নীত হওয়ার আকুতি অন্ত্যজদেরও বিভাজিত করে রেখেছে।উচ্চবর্ণরাই দলিতদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন করেন তা সবসময়ই নয়, অন্ত্যজরাও অন্ত্যজদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন করেন ‘ছোটোজাতের’ অস্পৃশ্যতায়। চারখানি ঘর তো ছিলই, এই ঘরের মধ্যে ঘর তুলেছে দলিতরাও।
এ রকম হাজার হাজার ঘটনা উল্লেখ করা যায়। তাতে লাভ কী ! এমন ঘটনা যেমন মায়াবতীর রাজ্যে সংঘটিত হয়, তেমনি কমিউনিস্টদের রাজ্যেও হয়।ভারতের যে-কোনো গ্রাম্য পুলিশকে তার কর্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে বলবে, তাদের কাজ ‘শান্তি রক্ষা করা’। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটি করা হয়, অবশ্যই বর্ণপ্রথাকে ধারণ করার মাধ্যমে। কারণ দলিতদের উচ্চাভিলাষই শান্তি ভঙ্গ করে।মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি  ১৯২১ সালে তিনি তার ‘নবজীবন’ নামের গুজরাটি জার্নালে লিখেছেন – “আমি বিশ্বাস করি যে বর্ণ প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত বলে হিন্দুধর্ম আজও বেঁচে আছে।বর্ণ প্রথা লোপ করে পাশ্চাত্য ইউরোপিয়ান ব্যবস্থাকে গ্রহণ করা মানে হচ্ছে হিন্দুদের অবশ্যই বর্ণপ্রথার মূল ভিত্তিকে অর্থাৎ তাদের পূর্বপুরুষের পেশাকে ত্যাগ করতে হবে।উত্তরাধিকার সূত্র একটি চিরন্তন সূত্র।একে পরিবর্তন করা মানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।আমার কাছে একজন ব্রাহ্মণের কোনো দাম নেই যদি জীবনের মূল্যেও আমি তাকে ব্রাহ্মণ না ডাকতে পারি।যদি প্রতিদিন একজন ব্রাহ্মণ শূদ্রতে এবং একজন শূদ্র ব্রাহ্মণে রূপান্তরিত হয় তবে তা বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে।”


নমশূদ্ররা দাবি করেন বল্লালসেনের আমলেই তাদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার হরণ করে, তাদের ‘চণ্ডাল’ নামে অভিহিত করা হয়। তখন থেকেই তারা হিন্দু সমাজের নিন্মতর বর্ণে অধঃপতিত হয়ে যায়।তবে ১৯১৯ সাল নাগাদ ইংরেজ শাসনকালে আদমসুমারিতে অসন্মানজনক ‘চণ্ডাল’ নামের পরিবর্তে তাদের নতুন নাম ‘নমশূদ্র’ আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করে।ভারতের ব্রিটিশ-মুক্তির পর চণ্ডাল তথা নমশূদ্রের নতুন পরিচয় হল ‘তফসিলি’ (তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং ওবিসি বা অনগ্রসর জাতি)।তফসিলি সৃষ্টি করে হিন্দু সমাজে তৈরি হল নতুন বর্ণবাদ। আর তাই ৭০ বছরেও শূদ্রাবস্থার অবসান হল না। তফসিলিভুক্ত সব জাতিই নিন্মবর্ণের। অর্থাৎ পূর্বে যারা শূদ্র ছিলেন, আজও তারা শূদ্রই আছেন।কারোর কারোর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তফসিলি জাতিরা [Scheduled Castes (Dalit)] কিছুটা ভালো অবস্থায় থাকলেও তফসিলি জনজাতিদের [Scheduled Tribes (Adivasi)] একদম সঙ্গিন।
কারণ সদিচ্ছার অভাব।তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতিরা সত্যি সত্যিই সাম্যবাদ সম-মর্যাদা ভোগ করুক এটা কেউ কোনোদিন মনেপ্রাণে চায়নি।ব্রিটিশ-ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তব সম্ভাবনা একটা তৈরি হয়েছিল বর্ণবাদের অস্পৃশ্য সমাজব্যবস্থার জগদ্দল পাথরকে উপড়ে ফেলার।কিন্তু বাস্তবে সেই উজ্জ্বল সম্ভাবনাটাকে বাস্তবায়িত করা গেল না।কেন বাস্তবায়িত করা গেল না ? ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্বে প্রায় সবাই-ই ছিলেন উচ্চবর্ণের লোক। তাঁরা কেলই নানা পথে নানা ফন্দি-ফিকিরে নরমে-গরমে, কখনো আপোস করে কখনো পাপোস হয়ে নিজেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতেই বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন।মৌলিক সামাজিক-অর্থনৈতিক কিংবা মতাদর্শগত কোনো অর্থেই পরিবর্তন ঘটানোর প্রকৃত ইচ্ছা প্রায় ছিলই না।জমিদারি স্বার্থের বিরুদ্ধে তাঁরা কখনো যেতে চাননি। বস্তুত শ্রেণিগত বিচারে যাওয়াটা তাঁদের পক্ষে  সম্ভব ছিল না।অতএব প্রাচীন সমাজের জাতিবর্ণগত অবস্থানকে মৌলিকভাবে পরিবর্তনের কোনো কর্মসূচি কোনোদিনই জাতীয় আন্দোলনে নেওয়া হয়নি।জাতীয় আন্দোলনে ক্রমবর্ধমান জোয়ারে নিচুবর্ণের মানুষেরা প্রচুর সংখ্যায় এলেও জাতিবর্ণগত বিভেদের মূল উৎপাটনে জাতীয় নেতৃত্বের অনীহা ও বাস্তব সক্রিয়তার অভাব অনেক সময়েই তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে।দূরে সরিয়ে দিলেই কি দূরে সরানো যায় ! শূদ্রজাতিদের যতই  এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে জাতীয় নেতৃত্ব শূদ্রেরা ততই সংঘবদ্ধ হয়েছে।ততই প্রকটিত হয়েছে।
১৯২৭ সাল। সেদিন ছিল বড়োদিন। বাবাসাহেব ডাক দিলেন মহারদের সহ অন্যান্য দলিতদের – এসো, আমরা ওই নিষিদ্ধ জলে স্নান করি, ওই নিষিদ্ধ জল পান করি। ‘নিষিদ্ধ জল’ কেন ! যুগ যুগ ধরে চাভাদর সরোবরের জল স্পর্শও করতে পারত না দলিতরা। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের এটাই নিষেধাজ্ঞা। সেই সরোবরের জল বর্ণহিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-কুকুর-গোরু-মোষ-গাধা কারোরই জন্য নিষেধ ছিল না, বাদ ছিল দলিতরাই। যাই হোক, বাবাসাহেবের ডাকে সেই সরোবরে জমায়েত হলেন হাজার হাজার দলিত মানুষ।বিশাল এক সমাবেশ হল। উচ্চবর্ণদের সাহসে কুলালো না একজন দলিতের মাথা ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা করার।পুলিশ পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অকুস্থলে।হাজার হাজার দলিত মানুষ সেই সরোবরের জলে নেমে পড়লেন। শিশুদের মতো জলে নেমে স্নান করতে থাকলেন এবং নাচতে থাকলেন।সরোবরের পাড়েই আয়োজিত হল বিরাট জনসভা। পুড়িয়ে দেওয়া সেই গ্রন্থ, যে গ্রন্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ শূদ্রদের ঘৃণ্য করেছে – মনুসংহিতা।সেইদিন থেকে এমন গ্রন্থ সমাজ থেকে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। উচ্চবর্ণের উচ্চাসন টলে যাবে যে !
১৯৩২ সালে দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন – “সকল জাতিকেই আমাদের জলচল করিয়া লইতে হবে।” কীভাবে জলচল করে নেওয়া যাবে যতদিন মনুসংহিতার প্রভাব থাকবে ! ভারতের সেকুলার শাসনকর্তারা ভারতের অস্পৃশ্য-অচ্ছুৎদের জলচল করে তোলার শিক্ষা দিতে ভয় পায়, নিতেও। কারণ হিন্দুত্বকে ধ্বংস না নিন্মবর্গদের জলচল করা সম্ভব নয়। তাই বোধহয় দলিতদের শ্লোগান এমনই হয়ে যায় – “তিলক, তরাজু অওর তলোয়ার ইনকো মারো জুতে চার”।ব্রাহ্মণের তিলক, ক্ষত্রিয়ের তলোয়ার এবং বেনিয়ার তরাজু (দাঁড়িপাল্লা)। উত্তরপ্রদেশের ‘চামার কি বেটি’ মায়াবতী মুখে দলিতদের কথা বললেও ব্রাহ্মণরা স্বাগত ছিলেন। তাঁর কাছে বেনিয়া-ক্ষত্রিয়রা অচ্ছুৎ হলেও, ব্রাহ্মণরা নন।ক্ষমতার রাজনীতি বড়ো বালাই, সত্যি ! অথচ মনুবাদের যথার্থ এবং প্রবলতম প্রবর্তক এই ব্রাহ্মণরাই। কারণ কী ? বর্ণযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ? হ্যাঁ, ভারতের প্রথম বর্ণযোদ্ধাই পরশুরাম, যিনি ব্রাহ্মণ।একবার নয়, একুশবার ধরিত্রীকে নিঃক্ষত্রিয় করার যুদ্ধ। ব্রাহ্মণ বনাম ক্ষত্রিয়ের যে দ্বন্দ্ব একদা আর্য ও দ্রাবিড়ভূমিকে দীর্ণ করেছিল, ব্রাহ্মণদের তরফে পরশুরামই ক্ষত্রিয় হৈহয় অধিপতি কার্তবীর্যার্জুনকে সপরিবার নিধন করে তার শীর্যবিন্দু রচনা করেন।এমন বর্ণযোদ্ধাকে ‘দেবী’ মায়াবতী আর কোথায় পাবেন ! সেই কারণেই কাঁসিরামের মানসপ্রতিমা মায়াবতীকে উত্তরপ্রদেশের জেলায় জেলায় ‘ব্রাহ্মণ সম্মেলন’ করে বেড়াতে দেখা যায়। সেই ব্রাহ্মণ সম্মেলনের মঞ্চে দেখা যায় একদিকে একটি বাবাসাহেব আম্বেদকর, অন্য একটি পরশুরামের মাল্যবান কাট-আউট। একটা বড়ো প্রশ্ন – তা হল উচ্চবর্ণের সর্বোচ্চ আসনে উপবিষ্ট ব্রাহ্মণরা কেন ঘৃণ্য ‘চামার কি বেটি’ মায়াবতীর বহুজন সমাজের হাতি চিহ্ন-সংবলিত পতাকার নীচে আশ্রয় নিল ? আসলে উত্তরপ্রদেশে সৃষ্ট হওয়া গড্ডলিকা প্রবাহ। এখানে দলিতদের সংগঠন আছে, জনজাতিদের সংগঠন আছে, অনগ্রসরদেরও সংগঠন আছে – ব্রাহ্মণদের কোনো সংগঠন নেই।তার মানে কী ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্যাবর্তের দলিতায়ন থেকে দলিতের ক্ষমতায়নের রূপান্তর !
ভারতীয় সংবিধান ভারতের অনগ্রসর জনসমষ্টিকে তিনভাগে ভাগ করেছে। (১) তফসিলি জাতি (Scheduled Caste বা S.C.), (২) তফসিলি উপজাতি (Scheduled Tribes বা S.T.) এবং (৩) অন্যান্য অনগ্রসর জাতিসমূহ (Other backward Classes বা O.B.C.)।ভারত সরকার সংবিধানের ৩৪০ ধারা অনুযায়ী ভারতের অনগ্রসর শ্রেণিগুলির সমস্যাদির অনুসন্ধান এবং তা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার সুপারিশ গ্রহণের জন্য এ পর্যন্ত দুটি কমিশন নিযুক্ত হয়েছে।১৯৫৩ সালে কাকা কালেলকার কমিশন এবং ১৯৭৮ সালে মণ্ডল কমিশন। লক্ষণীয় যে, সংবিধান তফসিলি জাতি বা উপজাতিদের তালিকা নির্ণয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিনির্ধারণ করলেও অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়গুলির ক্ষেত্রে তেমন কিছু করেনি। কেবল বলা হয়েছে, যে আদেশবলে কমিশন নিযুক্ত হবে সেই আদেশেই কমিশনের কার্যপদ্ধতি বিবৃত থাকবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যক্তি বা সম্প্রদায়েরই সংগত অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা থাকে দেশের শাসন-প্রশাসনে অংশগ্রহণ করার। যে পরিস্থিতি দেশের ৫২% জনগণকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তার জরুরি সংশোধন প্রয়োজন।
ভারত স্বাধীনতা অর্জনের পর যে নতুন সংবিধান গৃহীত হল তাতে ন্যায়, স্বাধীনতা এবং সমতার প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথা বলা হল। বলা হল আইনের চোখে সব নাগরিকই সমান এবং ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী আইন তাদের এই অধিকার রক্ষা করবে।১৫ এবং ১৬ নম্বর ধারা মোতাবেক কারও প্রতি বৈষম্য না-করার নীতি গৃহীত হল।১৭ নম্বর ধারা মোতাবেক অস্পৃশ্যতার মতো ঘৃণ্য প্রথা নিষিদ্ধ করা হল।পাশাপাশি সংবিধান সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ সহায়তাকে স্বীকৃতি দেয়। কিছু পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিপূরণমূলক বৈষম্যের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্টের ১৯ নম্বর সাংবিধানিক আদেশে (তফসিলি জাতি) যেসব জাতিকে তফসিলি জাতি বলে গণ্য করা হবে তার তালিকা দেওয়া হয়। শুধু হিন্দুরাই নয়, শিখ-বৌদ্ধরাও তফসিলি জাতিভুক্ত। পূর্বে যাদের অস্পৃশ্য জাতি বলা হত তারাই স্বাধীনোত্তর ভারতে তফসিলি।এদের সুযোগ-সুবিধার কথা বলা আছে তা মূলত তিন প্রকারের। প্রথমত : এই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আইনসভায়, সরকার-চালিত বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ। দ্বিতীয়ত : ঋণ, স্কলারশিপ, জমির পাট্টা ইত্যাদি নানাবিধ আর্থিক সুবিধা। তৃতীয়ত : অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে নানাবিধ ব্যবস্থা এবং আবদ্ধ শ্রমিকদের মুক্ত করার কিছু পদক্ষেপ।বাস্তবে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আধিপত্য ছিল ইংরেজি জানা শহুরে রাজনৈতিক নেতাদের।বস্তুত রাজ্য ও স্থানীয় স্তরে উচ্চবর্ণের এবং অন্তত উত্তর ভারতে এরা ছিলেন উচ্চবর্ণ জমি মালিক শ্রেণির।দক্ষিণ ভারতে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা ছিল। কারণ পঞ্চাশের দশকের মধ্যেই নিন্মবর্ণ নেতারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঢুকতে শুরু করেছিলেন। ১৯৬০ সালে তামিলনাড়ুতে দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাঘাম ক্ষমতায় আসে। এটা ছিল একটি অ-ব্রাহ্মণ পার্টি। ৫০/৬০  দশকে দক্ষিণ ভারতের নিন্মবর্ণগুলি নিজেদের পার্টি ও নেতা তৈরি করে ফেলেছিল।৮০ এবং ৯০-এর দশকে উত্তর ভারতেও নিন্মবর্ণ রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়ে যায়।বারংবার লালুপ্রসাদ যাদব, কাঁসিরাম এবং মায়াবতীর নাম সমনে আসতে থাকে।১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ এবং আবার ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ মূলত নিন্মবর্ণ রাজনৈতিক জোট দিল্লির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে।
১৯৪৭ সালে অখণ্ড ভারত খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল রাজনৈতিক কুটিলতায়। ঘরছাড়া হয়ে ভেসে গেল লক্ষ লক্ষ মানুষ, এদের মধ্য একটাো অংশই ছিল দলিত শ্রেণি।১৯৪৭, ১৯৪৯-এর পর ১৯৫০ সালে সরকারি হিসাব অনুযায়ী আসাম-ত্রিপুরা-পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে পনেরো লক্ষ বিরাশি হাজার উদ্বাস্তু ভারতে চলে আসে। এদের মধ্যে প্রায় ১৬ আনাই ছিল দলিত শ্রেণি এবং বেশিরভাগই নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ। ভারতে এদের অবস্থা মোটেই ভালো হয়নি, আজও। সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান চালু হতেই যে জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়ন শেষ হয়ে গেল তা বলা যায় না।তবে পূর্বে যেমন সমস্ত রকমের নিপীড়ন মুখ বুজে সহ্য করে যেত, এখন তেমন নয়।প্রতিবাদ করতে শিখেছে।দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলিত হতে থাকল শূদ্র জাগরণের তরঙ্গ।নিচুজাতির মানুষেরা নিজেদের দাবি উত্থাপন করার এবং জাতিব্যবস্থাকে বিরোধিতা করার আন্দোলন ক্রমশ জঙ্গিরূপ গ্রহণ করতে থাকে। মন্দিরে ঢোকা, পুকুর-কুয়ো-রাস্তা ব্যবহারের আন্দোলনের মধ্যে এটা লক্ষ করা যায়। ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার বিরোধিতা শুধু অস্পৃশ্য জাতিগুলি করেনি, যারা অস্পৃশ্য ছিল না সেই শূদ্র জাতিগুলিও সামনে এগিয়ে আসতে থাকে।দক্ষিণ ভারতে ই ভি রামসামির নেতৃত্বে এই শূদ্র প্রতিবাদ সুসংহত রূপ ধারণ করে।সংগঠিত হল এবং বিপ্লবী রূপ গ্রহণ করল। তিনি তামিলনাড়ুর অব্রাহ্মণদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পশ্চাদপদতার জন্য ব্রাহ্মণদের এবং তাদের সংস্কৃতভিত্তিক ভাবধারাকে দায়ী করে।তিনি সেই সংস্কৃতির শিকড় সমূলে উৎপাটন করতে চেয়েছিলেন।শুধু তাই নয়, যেসব বিষয়ে ই ভি আরের নেতৃত্বাধীন ‘আত্মসম্মান’ আন্দোলন লাগাতার সংগ্রাম গড়ে তোলে সেগুলি হল মন্দিরে প্রবেশ, সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং রাস্তয় প্রবেশের অধিকার, অস্পৃশ্যতা বর্জন, তদুপরি ব্রাহ্মণ্যবাদ-জাতিব্যবস্থা-ধর্মের বিরোধিতা করা। এই আত্মসম্মানপন্থীরা ছিলেন ব্রাহ্মণ পুরোহিত ও ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী, ধর্মশাস্ত্র বিরোধী এবং ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টিকোণ ও রীতিনীতির বিরোধী তথা ধর্মীয় উৎসবের বিরোধী।
সবই আছে, কিন্তু প্রয়োগ কোথায় ? সুরক্ষা আছে, সুরক্ষার কবচও আছে – কার বাজুতে বাঁধা আছে সেই কবচ ? কেমন সেই কবচ ? একনজরে দেখে নিতে পারি সকলের অবগতের জন্য।তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতিদের উপর তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি নয় এমন কেউ যে যে নিপীড়ন চালানোর অপরাধে যেরকম শাস্তির বিধান আছে, সেগুলি হল – (১) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো ব্যক্তিকে কোনো অখাদ্য বা অপেয় বস্তু খেতে বা পান করতে বাধ্য করলে, (২) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো মানুষের বাড়ির উঠোনে বা আশেপাশে মলমূত্র, বর্জ্য পদার্থ, মরা পশু বা অন্যান্য আপত্তিকর বস্তু নিক্ষেপ করলে এবং এইভাবে সেই ব্যক্তিকে আহত, অপমানিত বিরক্ত করলে, (৩) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো মানুষের শরীর থেকে কাপড় খুলে নিলে, বা তাকে নগ্ন করে হাঁটায়, বা তার মুখে রং মাখিয়ে হাঁটায় বা এই ধরনের মানবিক মর্যাদা হানিকর অপর কোনো কাজ করলে, (৪) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো ব্যক্তির মালিকাধীন বা যথাসাধ্য কর্তৃপক্ষ তাকে যে জমি চাষ করার জন্য দিয়েছে সেই জমি অন্যায়ভাবে দখল করার চেষ্টা করলে বা সেই জমি হস্তান্তরিত করে নিলে,(৫) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো ব্যক্তিকে তার জমি বা বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করলে অথবা জমি, বাসস্থান বা জলের উপর যে অধিকার সে ভোগ করছে তা থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করলে, (৬) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো মানুষকে ‘বেগার’ বা অন্য কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক শ্রম করতে বাধ্য করলে, (৭) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো ব্যক্তিকে নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে বা না দিতে বাধ্য করলে অথবা আইনানুগ নয় এমনভাবে ভোট দিতে বাধ্য করলে, (৮) যদি তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো ব্যক্তির নামে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যমূলক মামলা করলে, (৯) কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে এমন কোনো তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা বা সাজানো অভিযোগ করে যার ভিত্তিতে ওই সরকারি ব্যক্তি সেই  তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষটির কোনো ক্ষতি বা তাকে বিরক্ত করলে, (১০) প্রকাশ্য স্থানে কোনো  তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি ভুক্ত মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করে বা ভয় দেখায়, (১১) কোনো  তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত মহিলাকে অসম্মান বা শ্লীলতাহানির জন্য ভয় দেখালে, (১২) নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো  তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত মহিলার উপর যৌনশোষণ চালায়(এই ক্ষমতা না থাকলে মহিলাটি যৌনক্রিয়ায় রাজি হবে না), (১৩) তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্তদের ব্যবহার্য পুকুর, কুয়ো বা খালের জল দূষিত করলে এবং সেটাকে ব্যবহারের অযোগ্য করলে, (১৪) সর্বসাধারণের ব্যবহার্য যেসব স্থান অন্যরা ব্যবহার করে এবং তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতিদের সেগুলি ব্যবহার করতে বাধা দিলে, (১৫) কোনো তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি মানুষকে গ্রাম বা তার বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য করলে – এইসব অপরাধের জন্য অপরাধীর ন্যূনতম ছয়মাস এবং সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
এখানেই শেষ নয়, যদি (১) তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি নয় এমন কেউ তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় (এটা জেনে যে ওই সাক্ষ্যের ফলে তার মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে), তাহলে এই অপরাধের জন্য তার যাবজ্জীবন সাজা এবং জরিমানা হতে পারে; এবং যদি এই ধরনের সাক্ষ্যের ফলে কোনো তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতির তালিকাভুক্ত ব্যক্তির সাজা ও মৃত্যুদণ্ড হয়ে যায় তাহলে মিথ্যা সাক্ষ্যদানকারী ব্যক্তির সাজা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।(২) যদি অগ্নিসংযোগ করে বা বিস্ফোরক ফাটায় (এটা জেনে যে তাতে তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতির মানুষদের সম্পত্তির ক্ষতি হতে পারে) তাহলে ওই ব্যক্তির সর্বনিম্ন ছয়মাস সাজা হতে পারে বা সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
রাষ্ট্রের কাছে গচ্ছিত আছে আপনাদের রক্ষাকবচ, আর আপনাদের কমণ্ডলুতে আছে ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষাকবচ। ছুঁড়ে ফেলে দিন। একদা যে ব্রাহ্মণ্যবাদকে ঘিরে হিন্দুধর্ম পরিপূর্ণতা এবং পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল, সেই ব্রাহ্মণ্যবাদের কারণেই হিন্দুধর্ম ক্ষয়িষ্ণুর পথে।ব্রাহ্মণ্যবাদই হিন্দুধর্মের আধার। এই ব্রাহ্মণ্যবাদ ধ্বংস নাহলে হিন্দুধর্ম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কালের স্রোতে।বহু বিভাজনে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। যতদিন না এক মন এক মত এক জাতি এক ধর্ম হবে ততদিন বিচ্ছিন্ন হতে হতে একটা জাতি অক্ষমের লড়াই করতে থাকবে আরএসএসের হাত ধরে।আক্ষেপের বিষয় হল এই যে, ব্রাহ্মণ্যবাদ যত-না মুষ্ঠিমেয় উচ্চবর্ণীয়রা অনুসরণ করে তার চেয়ে অনুসরণ করে তথাকথিত নিন্মবর্ণীয় বৃহৎ সংখ্যক মানুষেরা।অথচ বিবেকানন্দ থেকে জগজীবন রাম প্রত্যেকেই পইপই করে বলেছেন – ব্রাহ্মণ্যবাদ ধ্বংস করো, পুরোহিততন্ত্রের বিনাশ করো। শুধু ‘আমরা দলিত আমরা দলিত’ বলে চিৎকার করলে কিস্যু হবে না, ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদগুলি ইগনোর করতে হবে। সেইজন্যই জগজীবন রামের কথা স্মর্তব্য – “Any movement for social equaliy must be anti-Brahmin in character.” অর্থাৎ সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যদি কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে  হয় তবে তা হতে হবে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী।“হিন্দুধর্মের যথার্থ নাম ব্রাহ্মণ্যবাদ, আর হিন্দুধর্ম হল প্রকৃতপক্ষে জাতব্যবস্থা। ব্রাহ্মণ্যবাদ ধ্বংস নাহলে ভারতে সমাজতন্ত্র আসতে পারে না (“Brahminism, which is the appropriate name for Hinduism, is nothing but Cast System. Socialism will not come to India without destroying Brahminsim” – V.T. Rajshekhar)।
ইগনোর করুন ব্রাহ্মণ্য-ব্যবস্থা।কীভাবে ইগনোর করবেন ? শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে ব্রাহ্মণদের নির্দেশ হলে এমন সব নির্দেশ অগ্রাহ্য করুন। কারণ তথাকথিত শাস্ত্র যা, শাস্ত্রের লিখন যা – তার সবই ব্রাহ্মণ-শাসক দ্বারা রচিত। যেমন – মন্ত্রপাঠ করে বিয়ে করা (রেজিস্ট্রি করে ম্যারেজ করুন, সামর্থ্য অনুযায়ী প্রীতিভোজ দিন )। শিশু প্রথম ভাত খাক এবং তা মামাই খাওয়াক (পুরোহিত আনবেন না), প্রীতিভোজও সামর্থ্য অনুযায়ী।পুজো করতে চাইলে আপনি নিজে করুন, পুরোহিতের প্রয়োজন নেই, মন্ত্রও লাগে না।প্রিয়জন বিয়োগে মৃতদেহ দাহ করুন বা মাটি দেন – এখানেই সৎকার শেষ করুন। হবিষ্যি খাওয়া, অশৌচ পালন, ধরা বাঁধা, মস্তক মুণ্ডনাদি ক্ষৌরকর্ম, পিণ্ডদান, ব্রাহ্মণভোজন, প্রীতিভোজ বাতিল করুন। সবচেয়ে উত্তম হয় যদি আপনার আত্মীয়ের মরদেহ মেডিক্যালে বিজ্ঞানের স্বার্থে দান করতে পারেন। উত্তম এই কারণে যে, মানুষের মৃত্যুর পর মরণোত্তর দেহদানের পর কী করণীয় তার কোনো শাস্ত্রীয় অঙ্গুলি-নির্দেশ বা বিধান নেই।তাই কোনো চাপও থাকছে না।অ-কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিরোধিতা করুন, এ ব্যবস্থা আপনার কোনো কাজে লাগে না। এ ব্যবস্থা আপনাকে ভয়ানকভাবে চিহ্নিত করে যে, আপনি দুর্বল, অযোগ্য, আপনি ছোটোজাত, আপনি পরাজিতের দলে, আপনি অসুর-দৈত্য-দানো।যোগ্যতার মাপকাঠিতে সমস্ত ক্ষমতা অর্জন করতে হবে, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে হবে, নইলে নয়।দয়া নয়, অর্জন করে নিতে হবে। আপনারা সংখ্যালঘু নন, আপনারাই সংখ্যাগুরু।
==========================================================
তথ্যসূত্র : ১. ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস – নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ২. বৌদ্ধ দর্শন – রাহুল সাংকৃত্যায়ন ৩. অলৌকিক নয় লৌকিক (তৃতীয় খণ্ড) – প্রবীর ঘোষ ৪. মুসলিম সমাজ কয়েকটি প্রাসঙ্গিক আলোচনা – মইনুল হাসান ৫. বাংলার সমাজে ইসলাম সুচনাপর্ব – অতীশ দাশগুপ্ত ৬. ব্রাহ্মণ্যবাদ – রণজিৎ কুমার সিকদার ৭. অনীক(অক্টোবর-নভেম্বর ২০০৫) ৮. আমি শূদ্র, আমি মন্ত্রহীন – কঙ্কর সিংহ ৯. মনুসংহিতা – সুরেন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১০. ক্ষমতা হস্তান্তর ও দেশবিভাগ – লাডলীমোহন রায়চৌধুরী ১১. অনীক (অক্টোবর-নভেম্বর ২০০৫) ১২. মানবাধিকার ও দলিত – দেবী চ্যাটার্জী, ১৩. শূদ্র জাগরণ – গৌতম রায়, ১৪. বর্তমান ভারত – স্বামী বিবেকানন্দ, ১৫. প্রাচীন ভারতে শূদ্র – রামশরণ শর্মা, ১৬. জাতের বিড়ম্বনা – শ্রীউপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@
আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে ভারতের কেরল অঙ্গরাজ্যে হিন্দুদের মধ্যে একপ্রকার ট্যাক্স বা কর প্রচলিত ছিল। করটির নাম স্তনকর (Breast Tax),স্থানীয় ভাষায় নাম মুলাককারাম (Mulakkaram)।এ সময় নিয়ম ছিল শুধু ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কোনো হিন্দু নারী তার স্তনকে ঢেকে রাখতে পারবে না। শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ শ্রেণির হিন্দু নারীরা তাদের স্তনকে এক টুকরো সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে পারত, বাকি হিন্দু শ্রেণির নারীদের প্রকাশ্যে স্তন উন্মুক্ত করে রাখতে হত। তবে যদি কোনো নারী তার স্তনকে কাপড় দ্বারা আবৃত করতে চাইত, তবে তাকে স্তনের মাপের উপর নির্ভর করে ট্যাক্স বা কর দিতে হত। এই আজব করকেই বলা হয় স্তনকর বা ব্রেস্ট ট্যাক্স।
১৮০৩ সালে নাঙ্গেলি (Nangeli) নামক এক সাহসিনী নারী তার স্তনকে আবৃত করে রাখে।  গ্রামের ট্যাক্স কালেকটর যখন তার কাছ থেকে স্তনকর দাবি করেন, তখন নালেঙ্গি তা দিতে অস্বীকার করে এবং নিজের দুটি স্তনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে পাতা দিয়ে মুড়ে ট্যাক্স কালেকটরকে দিয়ে আসে। তখন কাটা স্তন দেখে ট্যাক্স কালেকটর হতবাক হয়ে যায়। স্তন কেটে ফেলার কিছুক্ষণ পরেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য নাঙ্গেলির মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মৃত্যুশোকে নালেঙ্গির স্বামীও সঙ্গে সঙ্গেই আত্মহত্যা করে। এই ঘটনার পর থেকেই স্তনকর রদ করা হয়।
(সূত্র: (ক) https://en.wikipedia.org/wiki/Nangeli, (খ) http://goo.gl/cASX7x, (গ) http://goo.gl/G7cJcy)। তবে স্তনকর রদ হলেও দক্ষিণ ভারতে নারীদের স্তন আবৃত করার জন্য বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা পর্যন্ত করতে হয়েছে তাদের। উনিশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে যখন কিছু হিন্দু নারী তাদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার দাবি করে, তখন হিন্দু পুরোহিতরা স্পষ্ট করে বলে দেন, নিচু বর্ণের নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করা ধর্মবিরোধী। বিষয়টি নিয়ে ১৮৫৯ সালে দক্ষিণ ভারতে একটি দাঙ্গা পর্যন্ত সংগঠিত হয়। এই দাঙ্গার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার আদায় করা। এই দাঙ্গায় ‘কাপড়ের দাঙ্গা’ হিসাবেও পরিচিত। (সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Channar_revolt)।
অনেকে বলে থাকেন, ওই সময় মহিশূরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসনকর্তা টিপু সুলতান নাকি তরবারি ভয় দেখিয়ে অনেক হিন্দু নারীকে মুসলিম বানিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ইতিহাস বলছে, ওই সময় টিপু সুলতান হিন্দুদের এ জংলি কালচার মোটেও পছন্দ করেননি। তিনি চেয়েছেন এই নগ্নতা বন্ধ হোক। তিনি হিন্দু নারীদের আহবান করেছিলেন -- “যদি তোমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো, তবে কাপড় পরার অধিকার পাবে।” এ কথা শুনে হাজার হাজার হিন্দু সলিম শাসকরা এসে হিন্দুদের সভ্যতা শিক্ষা দেওয়াতে তারা কিছু সভ্যতা শিখতে পেরেছে। এ সম্পর্কে হিন্দু ইতিহাসবিদ সুরজিত দাসগুপ্ত বলেন, “ওই সময় হিন্দু নিম্নবর্ণের লোকদের উর্ধাঙ্গ অনাবৃত রাখতে হত। সে সময় ভারতবর্ষের কেরালাতে অমুক হিন্দু নারী ইসলাম গ্রহণ করেছে এটা বলার প্রয়োজন ছিল না, বলতে হত শুধু ‘কুপপায়ামিডুক’ -- এ শব্দখানার অর্থ ‘গায়ে জামা চড়িয়েছে’। (সূত্র: ভারতবর্ষ ও ইসলাম -- সুরজিত দাসগুপ্ত, পৃষ্ঠা: ১৩০-১৩১)









গ্রন্থ সমালোচনা লিঙ্গপুরাণ
--- পায়েল গুপ্তা
বইপোকা পাঠকরা বই পড়বেন এ আবার নতুন কথা কী ! কিন্তু সেই পাঠক যদি কোনো বিশেষ বই পড়ে আপ্লুত হয়, মুগ্ধ হয় এবং তা যদি সকলের সঙ্গে শেয়ার করে নিতে চায়, তাহলে কি খুব অন্যায় হবে ? বইটি অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ-গ্রন্থ লিঙ্গপুরাণ। এটি প্রকাশ করেছে আরোহী প্রকাশন। ৮০ টাকা মূ্ল্যের এই গ্রন্থে মোট ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে সাতটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে । লিঙ্গপুরাণনামক প্রবন্ধে লিঙ্গ বিষয়ক যাবতীয় তথ্য স্ত্রী-পুরুষ-হিজড়া নির্বিশেষে তদুপরি কৃত্রিম লিঙ্গের ব্যবহারবিধি বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া লিঙ্গভেদে কীভাবে বাঙালি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল তাও জানা গেল। এখানেই শেষ নয়, কীভাবে যৌনজীবন সুখময় হতে পারে তারও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে লিঙ্গপুরাণ : আদি ও অকৃত্রিম মহানায়কের উত্থান-পতননাম-প্রবন্ধে।ব্রাহ্মণরা তথা হিন্দুরাও যে একসময় পরম তৃপ্তি সহযোগে ভোজন করতেন সে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে প্রবন্ধকার নিছক গোরুর রচনা এবং গোমাতাপ্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ প্রবন্ধে এমন আরও অনেক সত্য উন্মোচিত হয়েছে । এই প্রবন্ধটি না পড়লে কত কিছুই-না অন্ধকারে থেকে যেত। ভাগ্যিস ! প্রবন্ধকার পদবিনামার চালচলনপ্রবন্ধে আলোচনা করেছেন পদবির বিবর্তন এবং উৎস নিয়ে। জানতে পারা গেল কীভাবে পদবির প্রচলন হল। জানতে পারলাম আদতে ব্রাহ্মণ কে বা কারা। জানা গেল ব্রাহ্মণ্যবাদের ব্যাখ্যা।লিঙ্গপুরাণগ্রন্থটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হল একটি শাস্ত্রীয় ভাষা এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।এই প্রবন্ধে যাবতীয় মিথ ভেঙে প্রবন্ধকার বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে সংস্কৃত ভাষা সংস্কার হতে হতে সমৃদ্ধ হল, সাবালক হল। সংস্কৃত ভাষার গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত সবকিছু রহস্য-আবরণ উন্মোচন করে দিয়েছে এই গ্রন্থটি।বাংলা-সংস্কৃত-লাতিন-জার্মান-ফরাসি-প্রাচীন ইংরেজি ইত্যাদি ভাষার শব্দের উৎস-তালিকাটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
যাঁরা শিক্ষকতার পেশার সঙ্গে যুক্ত তাঁদের প্রত্যেককে অনুরোধ করব এই মূল্যবান বইটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন এবং পড়ুন। অবশ্য প্রতিটি মানুষকেই এই গ্রন্থটি পাঠ করা উচিত।মানুষের অনেক কৌতূহলের অবসান ঘটাতে সক্ষম এই প্রবন্ধের সংকলনটি। বিষয় প্রকরণের প্রতি প্রাবন্ধিকের স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি গদ্যের গঠনশৈলীতে এনেছে বাধাহীন গতি, যা কোনো সময়েই পাঠককে ক্লান্তিভারে আচ্ছন্ন করবে না। প্রাবন্ধিকের খোলামেলা লঘু ফুরফুরে মেজাজে আমাদের জ্ঞানের সমুদ্রে তলিয়ে রাখে। যতদূর জানি, অনির্বাণবাবু শুধু একজন প্রাবন্ধিকই নন -- তিনি একাধারে সু-কবি, গল্পকার, সাংবাদিক, সুচিন্তক, মগ্ন পাঠক, অফুরন্ত জ্ঞানের অধিকারী। সর্বোপরি, দার্শনিক ঋগবেদ, মনুসংহিতা, পুরাণ, বৌদ্ধদর্শন, রামায়ণ, মহাভারত থেকে আধুনিক সাহিত্য তাঁর রক্তজালিকার শিরায় শিরায় বহমান। এইসব কিছুর পথপ্রদর্শক, তার প্রতিফলন ও অজস্র তথ্য সমৃদ্ধ বইটি আমাদের সকলের পড়া উচিত। আমি পেশাদার গ্রন্থ সমালোচক নই। বইটি পাঠ করে আমার যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, সেটাই আমার সকল বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম।
অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের জন্য বইটি বিষয়ে কিছু তথ্য : গ্রন্থের নাম : লিঙ্গপুরাণ। লেখক : অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রকাশক : আরোহী প্রকাশন। মূল্য : ৮০ টাকা।পৃষ্ঠাসংখ্যা : ১১২। প্রাপ্তিস্থান : পাতিরাম বুক স্টল, সন্দীপ বুক সেন্টার, কলেজ স্ট্রিট।
Aaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaa