This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

6 May 2016

সুজন ভট্টাচার্য

                         ফান্ডামেন্টাল






দিনসাতেক হয়ে গেল সমীরণের কোন পাত্তা নেই; সঠিকভাবে বললে সমীরণের কবিতার পাত্তা নেই। এমনটা সাধারণত হয় না। যেখানেই থাকুক, আর যে অবস্থাতেই থাকুক, পেজে ওর কবিতা আসবেই; কখনো কখনো দিনে দু-তিনটেও। আজ অবধি এর কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। এর আগে একবারই চব্বিশ ঘণ্টায় একটাও কবিতা আসে নি। পরে জানা গেল নেট ব্যালেন্স ছিল না।
 সমীরণ প্রথম দশকের কবি। প্রথম মানে মিলেনিয়াম হুল্লোড় কেটে যাবার বছর দশেক পরে যে দশকটা এল, তার কবি। এই দশকে ছেলেপুলে মায়ের পেট থেকে পড়ে না; ডাক্তারের ছুরিকাঁচির টাচে মাঝপথেই বেরিয়ে এসে সেক্টর ফাইভে নাম লেখাতে ছোটে। দশকটার মহিমা এমনই যে দিনের শেষে নারান উঠোনে রিক্সা পার্ক করে ঘরে ঢুকলেই বৌ ফোঁড়ন কাটে – মোবাইল না খেলি ঝদি আগের মতো চুল্লু খেতা, তালে সমসারটা বাঁচি যেত। নারান অবশ্য আগের মতো আর মুখে বা হাতে উত্তর দেয় না; দুটোই যে মোবাইলে এনগেজড।
 প্রথম দশকের কবি মানে অবশ্য এই নয় যে সমীরণের বয়েস মাত্র বছর- চারেক। মা ষষ্ঠীর কৃপায় আরো বছর চল্লিশেক পিছনে হাঁটলে তবে অনিমেষের বার্থ সার্টিফিকেট লেখা হচ্ছে দেখা যাবে। কিন্তু একটা গোটা দশকের ব্যক্ত- অব্যক্ত- নিরুক্ত সমস্ত কথা বলার দায় যে স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিতে চায়, তার বয়েস নিয়ে প্রশ্ন তোলে কোন আহাম্মক! জন্ম একটা বায়োলজিক্যাল ইভেন্ট , আর বয়েসটা সাইকোলজিক্যাল । যুগটাই যেখানে যাবতীয় ট্রান্স আইটেম নিয়ে নাচানাচির, তখন ট্রান্স ইউথ নিয়ে সমস্যা হবার নয় । অতএব সমীরণ প্রথম দশকের কবি ।
 প্রথম দশক জানে সর্ষের তেলে কোলেস্টেরল বাড়ে; তাই একমাত্র ভরসা জাপানি তেল। সমীরণের কবিতা সেই তেলেই ভাজা হয় বলে ওর ভক্তদের বিশ্বাস। কবিতা আর সাপখেলানো বাঁশির এক দুর্দান্ত ফিউশন। ক্লাস টুয়েলভের বায়োলজি বই পড়বার সৌভাগ্য যাদের হল না, সমীরণ তাদের অন্যতম ভরসা। সাতদিন আগেই সমীরণ নোটিশ দিয়েছিল কোন একটা মেলায় যাবে বলে। কিন্তু মেলায় গেলে তো আরো কবিতার বান ডাকার কথা! তাহলে! হল কি লোকটার? দিব্য ঠিক করল কলেজে না গিয়ে আজ স্যামিদার বাড়িতেই যাবে। প্রথমদিন ফোনটা তবু খোলা ছিল। কিন্তু তারপর থেকেই সুইচ অফ। কাজেই বাড়িতে না গিয়ে উপায় নেই।
 বেলটা বাজানোর বেশ খানিকক্ষণ পরে এক মহিলা দরজা খুলল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কাজের লোক।
- স্যামিদা আছে? দিব্য জিজ্ঞেস করে।
- অমুন কেউ এ বাড়িতে থাকে না। মহিলা দরজা বন্ধ করতে যায়। ভুলটা যে ওরই দিব্য বুঝতে পারে। কবিতা ঠেকের উপাধি কি আর কালের লোকের জানার কথা!
- সরি, সমীরণদা আছে? দিব্য শুধরে নেয়।
- আছে, শরীলডা ভাল না। মহিলার কথাগুলো বড্ডো রুক্ষ। কবির বাড়িতে কাজ করেও তাঁর কোনও ছাপ পড়ল না ভাষায়!
- একটু দেখা করা যাবে? দিব্য এবারে একটু ভয়েভয়ে জিজ্ঞেস করে।
- দাঁড়ান, জিগাইয়া আসি। কি নাম কমু? মহিলা দরজার পাল্লাটা প্রায় ভেজিয়ে ফেলেছে।
- বলুন, দিব্য এসেছে। ওর নাকের ডগার উপরে দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। দিব্যর খুব অপমানিত মনে হয়। স্যামিদার খুব কাছের লোক বলে সব্বাই জানে। এমনকি স্যামিদাও বহুবার বলেছে – আমার শেষ কবিতাটা লিখে পেনটা দিব্যকেই দিয়ে যাব; বাকিটা ওই লিখবে। বন্ধুরাও ওকে হিংসে করে এইজন্য। এত বড় মাপের একজন কবি ওকে এতটা কাছের বলে ভাবে বলে দিব্যও বিনাপ্রশ্নে স্যামিদার চা-সিগারেট- হাল্কা খাবারের দায় স্বেচ্ছায় নিজের মাথায় তুলে নেয়। গুরুসেবা না করলে কি আর বড় হওয়া যায়!
- ভিতরে আসেন। দরজাটা খুলে সেই মহিলা আবার এসে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য ছেলের মতো দিব্য ঘরে ঢোকে।
- চটিখান ঐখানে ছাড়েন, মহিলা যেন ধমকে ওঠে। স্যামিদার চালচলন এমনিতে বোহেমিয়ান। নিজেও বলে, সংসারের নিয়ম মানতে গেলে কবিতার শব্দগুলো জীবন থেকে পালিয়ে যাবে। সেই লোকটাকেও বাড়িতে এমন অত্যাচার মানতে হয়! ইউ আর গ্রেট স্যামিদা, দিব্য মনে মনে বলে।
- এইখানে বসেন। বাবু আইতাছে। মহিলার গলার ধাক্কায় দিব্য দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে। মহিলা ওর দিকে একবার কেমন একটা বিষ-নজরে তাকিয়ে ভিতরে চলে গেল। স্যামিদাকে আস্তে আস্তে হেঁটে আসতে দেখে দিব্য উঠে দাঁড়াল। এ কি অবস্থা হয়েছে লোকটার! মুখটা শুকিয়ে আদ্ধেক; চশমাটাও যেন নাকের ডগায় লগবগ করছে।
- কি হয়েছে তোমার ? আমরা সবাই তো পাগল হয়ে গেলাম।
 সমীরণ সোফায় হেলান দিয়ে বসে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব ক্লান্ত গলায় বলে - প্রায় মরেই গেছিলাম রে! মেলায় বাসি ছোলার চাট খেয়ে ডায়েরিয়া। একরাত লোকাল হসপিটালে কাটিয়ে পরদিন অ্যাম্বুলেন্সে সোজা কলকাতা। আমার অবশ্য তখন আর সেন্স নেই। কাল রিলিজ হল।
- একটা খবর দেবে তো! দিব্যর গলায় যে অভিমানের বাষ্প চড়াও হয়েছে বুঝতে সমীরণের কষ্ট হয় না। তাই বলে – কি করব বল! নিজেরই খবর ছিল না।
- তার মানে এ কদিন নো কবিতা! দিব্য বলে।
- আর কবিতা। সমীরণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
- এখন তো সেরে গেছ; বসে পড়। কবিতা এলেই তুমি কমপ্লিট সেরে যাবে। আর আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচব। ক্লিভেজ সিরিজটা জলদি নামাও, দিব্যর গলায় আবদারের সুর।
- ক্লিভেজ! অনিমেষের ঠোঁট বেঁকে যায়। - তিনদিন স্রেফ স্যালাইন, জানিস!
- সো হোয়াট! দিব্য প্রতিবাদ করে। - তাইবলে ক্লিভেজ আসবে না?

- দিব্য, আগে পেটভরে খেতে অ্যালাও করুক, তারপর ভাবা যাবে। ফাঁকা পেটে ক্লিভেজ আসে না রে ভাই; পেট ইজ মোর ফান্ডামেন্টাল দ্যান দা তলপেট। মেলার ট্রিপ থেকে এটাই শিখলাম।

রঞ্জন ঘোষাল

                             আখ্খুটে





কারুর কারুর থাকে আখ্‌খুটে স্বভাব। এটা খুঁটছে, ওটা ভেঙে ফেলছে, দফা রফা করে দিচ্ছে হাতের কাছে যা পাচ্ছে সেটাকে। আমাদের অঙ্ক করাতে আসতেন যে মাস্টারমশাই তাঁর এ রকম বদ্‌ রোগ ছিল। মেজদাদু নস্যির ডিবেটা বারান্দায় ইজি চেয়ারের পাশে রেখে একটু ভেতর বাড়িতে গেছেন। মাস্টার মশাই আমাদের দু’ভাইকে অঙ্ক কষাচ্ছেন, আর দাদুর নস্যির ডিবেটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। করতে করতেই চোখ পড়ে গেল তক্তপোষের ওপরে রাখা তবলা, তবলার হাতুড়ি আর পাউডারের কৌটোর দিকে। উনি প্রথমে হাতুড়িটা তুলে নিলেন, মুখে বলছেন এ কিউব প্লাস বি কিউব প্লাস থ্রি এ স্কোয়ার বি প্লাস থ্রি এবি স্কোয়্যার এটা কীসের ফর্মুলা? সেজদা উত্তরটা বলতে না পারায় উনি হাতুড়িটা নস্যির ডিবের ওপরে প্লেস করে দড়াম দড়াম করে মারতে লাগলেন, আর মুখে বলতে লাগলেন, কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো কাকে বলে এইবারে দেখিয়ে দিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই নস্যির ডিবের দফা রফা। আর উনি তখন পাউডারের কৌটোর ওপরে হাতের সুখ করে নিতে শুরু করলেন। অনেকটা পাউডার ভ্যাৎ করে বেরিয়ে এলো। উনি সেগুলো নস্যির ডিবেয় ভরতে ভরতে বললেন, তোদের মাথায় কী রে, খালি গোরব পোরা?
মেজদাদু এসে তাঁর নস্যির ডিবের এই হাল দেখে আর সামলাতে পারলেন না, বললেন, মাস্টার, এটা কী হচ্ছে?
মাস্টার অতীন শীল বললেন, কেন মেজোবাবু, বেয়াড়া ছেলেদের অঙ্ক শেখাতে গেলে চড়টা চাপড়টামারতেই হয়, এ নিয়ে অনুযোগ করলে তো আমি নাচার, এই বলে হাতুড়িটা দিয়ে পাউডারের কৌটোটিকে পিটিয়ে উনি ক্রমশ একটা চ্যাপ্টা চাক্‌তি বানিয়ে ফেলছেন। দাদুকে বলছেন, দুটোরই মাথা মোটা। এদের কিছ হবে না,। এদের ধর্‌ তক্তা মার পেরেক করে, বুঝলেন কিনা, তারপরেতে গুনছুঁচ দিয়ে সেলাই করে বেড়াল পার করার মত করে নদীর ওপারে ফেলে আসতে হবে - এই বলে মাস্টারমশাই উঠে পড়লেন। মেজদাদু বললেন কোথায় যাও অতীন মাস্টার?
উনি বললেন, একটা গুনছুঁচ পেলে এখনই এ দুটোকে বস্তায় পুরে - বলে পাউডারের কৌটো আর নস্যির ডিবের ভগ্নাবশেষ দুটো পকেট থেকে বার করে দেখালেন।
 মেজদাদু আজকাল আর স্তম্ভিত হন না। অতীন মাস্টার এ বাড়িতে দু জেনারেশনকে পড়াচ্ছেন, বাবা কাকারা অঙ্কে বরাবর ভালোও করে এসেছেন, ফলে অতীনমাস্টারকে কেউ কিছু বলে না।
 মাস্টার মশাই বেরিয়ে গিয়েও ফিরে এলেন। লজ্জিত কন্ঠে বললেন, দেখুন কাণ্ড মেজোবাবু, ভুল করে ব্ল্যাকবোর্ডটা পকেটে করে নিয়ে যাচ্ছিলুম। এই রইল ব্ল্যাকবোর্ড, বলে তবলার হাতুড়িখানা পকেট থেকে বার করে ময়নার খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়ে হন্‌হন্‌ করে বেরিয়ে গেলেন।
 আবার পরদিন সকালবেলা এসে মেজদাদুকে বলছেন, কালকের কাজটা মোটেই ভালো হয় নি। পার করে দিয়ে এলেই হ’ল? দুটো এঁড়েবাছুর বই ত নয় ! বাঘে যদি খায়? নজর রাখব বলে আমিও বসে রইলুম নদীর ওপারের সেই আঘাটায়।
 মাস্টারের মেয়ে এসে হাজির। বলছে, বাবা তুমি আমাদের ছাগলছানা দুটোকে নিয়ে সারারাত কোথায় গিয়েছিলে? আমরা ভেবে সারা।

 মাস্টারমশাই রাগতভাবে পকেট থেকে নস্যির ডিবে আর পাউডারের টিন বা তাদের ধ্বংসস্তুপদুটো বার করে বললেন এগুলোকে তোর ছাগলছানা বলে মনে হচ্ছে? বুদ্ধির ঢেঁকি একটি ! এরা তো ঘোষাল মশয়ের দুই নাতি – চন্দন আর রঞ্জন! বলি দু চোখের মাথা খেয়ে বসে আছিস নাকি রে সব?

মালঞ্চ রায়

                          আলোকবৃত্তে






আলোর বৃত্তে
 কোথা হতে আসো বন্ধু
 কোথায়ই বা যাও?
আমাকেও নিয়ে যেতে পারো তো?
ঘুরে আসি তোমাদের গ্রাম
 জেনে আসি সে গ্রামের নাম…
সে কি বড় বেশী দূর,
এ-এ-ক রাত পরে আসো নিয়ে রোদ্দুর!
এই সোনামাখা রোদ
 তার কতখানি দাম?
পারবো না দিতে জানি
 তবু হাতছানি দেয় ঐ নীল সরণী…
যদি পারো-
লিখে রেখো বুক জুড়ে
 আমার এই…তুচ্ছ মনস্কাম……
মাসিমণি… একটা মিষ্টি ডাকে চোখ তুলে দেখি, বৃষ্টিস্নাত স্নিগ্ধ সূর্যের মতই দ্যুতি ছড়িয়ে তিতলি দাঁড়িয়ে। হাতটা বাড়ানো, হাতে ধরা একটা কাগজ। আমি হেসে বললাম- আজই লিখেছিস? ধীরে ঘাড় নাড়লো ও। নামটা তিতলি হলেও মোটেই ছটফটে নয়। ভালোনাম যদিও আমারই রাখা, বড় প্রিয়… সূর্যতপা। সূর্যের সঙ্গে কোথায় যেন ওর নাড়ীর যোগ। নামটা এতো সার্থক হবে ভাবিনি কখনও!

আজও প্রতিদিন মর্নিং ওয়াক সেরে ফিরে আসার সময় দেখি তখনও ও ছাতে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে ঐ স্বর্ণগোলকটা দেখছে। তার পরতে পরতে রঙ বদল, গাছগাছালির সবুজ মায়া, পাখপাখালির কূজন যেন ওর মগ্ন চেতনায় অবচেতনে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। ছোট্টবেলা থেকেই ওর এই অভ্যেস। ও যে লেখে এটা জানতে পেরে একদিন ওকে বলেছিলাম- কি লিখিস প্রতিদিন? লজ্জায় লাল হয়ে বলেছিল- এমন কিছু নয়, দেখানোর মত না। বলেছিলাম- বেশ তো, যা লিখিস তাই নাহয় দেখাস। তোর অনুভব, তোর ভালোলাগা খাতার পাতায় লিখে রাখিস এটাই বা কম কি? তারপর থেকেই কিছু লিখলে আমাকে দেখায়। ওর মনের নানা রঙের নানা মাত্রিক অনুভবকে কচি মনের কচি হাতে পাতার পর পাতা ধরে রেখেছে। সবসময় সেগুলো যে কবিতা তা হয়ত নয় কিন্তু শিশুবেলা থেকেই ও যে কতখানি কল্পনাপ্রবণ ও সেই কল্পনার জগৎ কতখানি সুদূর প্রসারিত তা ওর কবিতা পড়লেই বোঝা যায়।

একদিন কথা প্রসঙ্গে ওর মাকে একথা বলতেই বিষন্ন হেসে বলল- আর কবিতা… সেই যে আপনি শিখিয়েছিলেন “ভোর হল দোর খোল খুকুমণি ওঠো রে”, তারপর থেকেই তো মেয়ে ঘুম থেকে উঠেই সটান চলে যায় ছাতে আর বিড়বিড় করে কবিতার মত কি যেন বলে আর পড়তে বসে আগেই সেগুলো খাতায় লেখে! সেই ওর লেখা শুরু। আপনাকে আর নতুন করে কি বলবো দিদি, আপনি তো সবই জানেন্, ওর বাবার চাকরীটা চলে গেল। এই অবস্থায় ওর পড়াশুনার কি হবে তা ঈশ্বরই জানেন, তার আবার কবিতা।

আমি সবই জানি, তাইতো ওর পড়াশুনার দায়িত্বটা আমিই তুলে নিয়েছিলাম। এমনিতে পড়াশুনায় যথেষ্ট ভালো তার উপর নম্র ও বাধ্যও। ওকে পড়াতে আমার কোন কষ্ট করতে হয়না। আর আমার কাজই বা কি, ওকে পড়িয়ে বরং সময়টা ভালই কাটে।

সত্যিই ওদের খুবই অভাবী সংসার। তিতলি এখন একটু একটু করে ১৫ই পা দিয়েছে। সামনেই মাধ্যমিক। এসব ভাবতে ভাবতেই আমি হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে বললাম- পড়া করেছিস তো, না শুধুই কবিতা লিখেছিস? যদিও জানি, এ শুধু প্রশ্নের জন্যই প্রশ্ন। তাতেও ও ছোট্ট করেই ঘাড় নাড়লো শুধু। হঠাৎ আমার মনে হল, ও আজ একটু বেশিই চুপচাপ! কিন্তু জিজ্ঞাসা করেও কিছুই জানতে পারলাম না। পারিবারিক কোন সমস্যা ভেবেই আমিও আর কোন জোর করলাম না। হাজার হোক এখন তো একটু বড় হয়েছে। এভাবেই দেখতে দেখতে একদিন ওর পরীক্ষাও এসে গেল, শেষও হয়ে গেল। আমার দেখেশুনে মনে হল, ভালভাবেই উতরে যাবে।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে স্তম্ভিত করে দিল একটি খবর- তিতলির বিয়ে!! প্রথমে নিজের কানকেই বিশ্বাস করে উঠতে পারলাম না। আমার বাড়ির পাশে বাড়ি, আমার আত্মীয়সম, কন্যাসম… প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে যে কোন সমস্যা আমার সাথে আলোচনা করে, আর সেখানে ওর বিয়ের কথা আমি জানবো না, এও কি সম্ভব! আর এইতো মাত্র ১৫/১৬ বছরের মেয়ে, এইটুকু মেয়ের বিয়ে! কিন্তু সবই সম্ভব, গুজব নয়, সত্যিই তিতলির বিয়ে। ওরা নাকি ভাল পাত্র পেয়েছে যাদের কোন দেনাপাওনা নেই। সুতরাং এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কি-ই বা হতে পারে।

এরই মধ্যে রেজাল্টও বেড়িয়ে গেল আর সবাইকেই দারুণ রেজাল্ট দিয়ে মুগ্ধও করল। কিন্তু মেয়ের মুখে তার কোন ছাপ নেই, কে যেন ওর স্নিগ্ধ স্বর্ণালী সৌন্দর্য আর দ্যুতিটাকেই ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিয়েছে।ওর বাবা-মা আমাকে অনেকরকম ভাবে কৈফিয়ত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, আমি শুনতে চাইনি। ওদের অনেক সমস্যা সে তো জানিই কিন্তু তাই বলে এই বয়সেই ওর স্বপ্নকে এভাবে চুরমার করে দিতে হবে? আমি তো আমার সাধ্যমত ওর অনেকটা ভারই তুলে নিয়েছিলাম। কেই বা আছে আমার, ওকেই তো সন্তানের মত আঁকড়ে ধরেছিলাম আমার শূন্য জীবনে। মাতৃত্ব কাকে বলে তাতো জানতে পারিনি, তিতলি আমার সেই অভাব অনেকখানি পূরণ করেছিল। ওর এই পরাজয় মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল আমার, বড্ড কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল- ওর নয়, আসলে পরাজয়টা আমার। ওর বাবা-মাকে কত করেই না বুঝিয়েছিলাম… কিন্তু ওরা বুঝিয়ে দিল, আসলে আমি ওর কেউ নই, কেউ নই!

ও হ্যাঁ, সেই যে কবিতাটা ও আমায় দিয়েছিল সেটাই ওর লেখা শেষ কবিতা ছিল।বিয়ের দিন পর্যন্ত আর কোন কবিতা লেখার চেষ্টা করেনি। বিয়ের দিন ওকে প্রবল বর্ষণে দলিত মথিত একটা ফুলের মতই দেখাচ্ছিল, যেন বিষাদ প্রতিমা! আমি একটা শেষ চেষ্টা করেছিলাম, হয়ত সান্ত্বনা। বলেছিলাম- তোর জীবনে হয়ত সত্যিই সূর্য উঠেছে তিতলি। তুই ঐ আলোটাকে চিনতে শেখ, দেখবি, তোর মনস্কাম ঠিক পূর্ণ হবে। তোর আকাশকে তুই নিজেই ভরিয়ে তুলতে পারবি কবিতার সোনারোদে।

এরপর ওদের সাথে যোগাযোগ নেই অনেকদিন হল। মেয়ের বিয়ে দিয়ে মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁইটাকেও বিক্রি করে দিয়ে ওরা অন্যত্র চলে গেছে আমাকে একা, একদম একা করে দিয়ে। আর জানা হল না, ওর চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা যে নীল আকাশ, তার বুকে কবিতার সোনারোদে নিজেকে সেঁকে নিতে পেরেছে কিনা। কিন্তু কেন জানিনা, মনটাকে বিশ্বাস করাতে বড় ইচ্ছা জাগে। এরই মধ্যে বছর দুয়েক কাটতে চলেছে। তিতলির কথা অনেকখানিই ফিকে হয়ে এসেছে। আমার একাকী জীবনের একাকীত্ব অনেকখানি গা সওয়া হয়ে গেছে। আমার ভাই বিশ্ব আজও নিয়মিত আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে যে ওর অমূল্য সময় দিয়ে সপ্তাহে একদিন করে ওকে অংক বিজ্ঞান পড়িয়ে যেত।আমার উত্থান-পতনহীন দিনগুলো যেন গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যায়, সময় থামতে জানেনা তাই।

এর মধ্যেই হঠাৎ একদিন ডোরবেল বেজে উঠল। কী আশ্চর্য, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, এই অসময়ে! কিছু যেন একটা স্বপ্নও দেখছিলাম… আমার চারপাশে যেন অজস্র আলো! এমন সময়ে কে! আজকাল শরীরে-মনে যেন ক্লান্তির পাহাড়! অনিচ্ছা সত্বেও উঠে বসে চোখ মেললাম। কিন্তু এ কে! নিজের চোখই নিজের সঙ্গে রসিকতা করছে কি! আমার কাজের মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে তিতলি! কিন্তু এ কেমন ক্লান্ত চেহারা, কোথায় যেন একটা বড় ছন্দপতন ঘটে গেছে! একসঙ্গে আমার মনে যেন প্রশ্নের ঝড় উঠল। কোনরকমে তাকে সামাল দিয়ে আমি প্রাণভরে আগে ওকে দেখতে থাকলাম। কেন যেন আমার দুচোখ দিয়ে বহু যুগ পরে ঝলকে ঝলকে জল চলে এল।

এতোক্ষণ তিতলিও যেন চুপচাপ আমাকেই দেখছিল। এবারে ও খুব শান্তভাবে আমাকে ধরে ওর পাশে বসালো। তারপর আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল- আমি জানি মাসিমণি, তুমি কি জানতে চাইছো। আমি এখন আপাততঃ এখানেই আছি। আমি চমকে উঠলাম- কেন রে? খুব ধীরেধীরে বলল- শাশুড়ীর সব অন্যায়-অত্যাচার মুখ বুঁজে সহ্য করেই মানসিক লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম শুধুমাত্র পড়াশুনাকে আঁকড়ে ধরেই। কিন্তু শাশুড়ির ইচ্ছেই নয় আমি আর পড়াশুনা করি, পরীক্ষায় বসি। ঘরের বৌয়ের এতো শিক্ষার নাকি প্রয়োজন নেই, তাই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম- আর তোর বর? বলল- ও মানুষটাকে আজও ঠিক চিনতে পেরেছি কিনা আমি নিজেই ঠিক জানিনা। কি করেই বা চিনবো বল? সারাদিন বাড়ি থাকেনা, ফলে কিছু জানতেও পারেনা। জানলেও এই সমস্যা সমাধানের কোনও ইচ্ছে হয়ত বা উপায়ও ওর নেই। কারণ… মুখটা আরও খানিকটা নীচু হল- রাতটুকুই তো তার আমাকে পাওয়ার একমাত্র সময়। আর ঠিক সেই সময়ে আমার না পাওয়া, হতাশা, কান্না হয়ত ওর বিরক্তির……! খানিক থেমে বলল- আমি বরকে বলেছি, পরীক্ষা দিয়েই ওখানে ফিরে যাবো। কিন্তু শাশুড়ি বলেছেন- ওনার কথা অমান্য করে পরীক্ষায় বসলে আমি যেন আর ও বাড়িতে পা না রাখি। তারপর মুখ তুলে দৃপ্ত কন্ঠে বলল- কিন্তু আমি জানি আমি কোন ভুল করিনি। ওঁরা আমাকে ঠিক ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। আমি সেদিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকবো। একটু দম নিল, তারপর বলল- এই পরীক্ষার সময়টা তুমি আবার আমাকে পড়াবে মাসিমণি?

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতই বলে উঠলাম- তুই আলোটা চিনতে পেরেছিস? ও দৃঢ়তার সঙ্গে বলে উঠল- কেন পারবো না? আমার সেই আলোটা তো আসলে তুমিই। সূর্যের আলোটা আমি! অবাক দৃষ্টি তিতলির মুখে স্থাপন করে মূহুর্তে যেন কোথায় হারিয়ে গেলাম। কত যুগ বাদে স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমার ভিতরের সেই ছোট্ট ছটফটে মেয়েটাকে যে অনেকখানি স্বপ্ন বুকে নিয়ে ছোট্ট নদীর মতই তিরতির করে বয়ে যেতো।তিতলি জীবনে না এলে যে ভুলেই গিয়েছিল, তমসা বলে কেউ ছিল, আজও আছে। তমসারও একটা জীবন আছে, স্বপ্ন আছে, ইচ্ছে আছে, প্রেম আছে, মাতৃত্ব আছে। শুধু ভাগ্যের দোষে সকলেই তার মধ্যে অন্ধকারই দেখেছে। অথচ এতদিন বাদে এই ছোট্ট মেয়েটা একটু আলোর অন্বেষণে বুভুক্ষু প্রাণের ভিতর সূর্যের আলো দেখল!তমসারও তবে আলো আছে!

যদিও ওর আর আমার লড়াই এক নয়, আলাদা, তবু বিষয়ের ভিন্নতা সত্বেও লড়াইয়ের চিত্রটা তো সেই একক মেয়েরই ছিল। মাতৃত্বে অক্ষমতা তো একটা মেয়ের নিজের সঙ্গেই নিজের সবচেয়ে বড় লড়াই। আর এ লড়াই তো কেবলমাত্র নিজের বা পরিবারের সঙ্গেই নয়, গোটা সমাজের বিরুদ্ধেই। অবশ্য সে যুগে কটা মেয়েই বা লড়াইয়ের ক্ষমতা রাখত আর এ যুগেই বা কজন রাখে। তাই হেরে যাওয়াটাকেই জীবনের বিধি বলে মেনে নিত। সময়ের হিসাব পালটেছে, সমাজের অবয়ব কি খুব কিছু পালটেছে আজও? মেয়েদের এই সবকিছু মুখ বুজে মেনে নেওয়া, তাদের এই ভালোত্ব অসহায়ত্বকেও কি কোন মূল্য দিয়েছে সমাজ কোনদিন? আর যে মেনে নেয়নি তাকে তো লাঞ্ছনা গঞ্জনার ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যেতে হয়েছে।

একই বাড়িতে থেকে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে পারিনি, একাকীত্বই যখন ভবিতব্য তখন অনাদরের ঘরের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে পথে পা রেখে অনিশ্চিত জীবনের একাকীত্বকেই বরণ করেছিলাম সাদরে। এই ছিল আমার অমার্জনীয় অপরাধ। হোক অনিশ্চিত, খোলা আকাশ তো একটা ছিল। শ্বাস নেওয়ার মত খোলা হাওয়া তো ছিল। সবুজ বনানী, পাখির কূজন, নদীর সঙ্গীত চলার পথে আমার সঙ্গী হয়ে প্রেরণা তো জুগিয়েছিল।

কিছু আগেও ভেবেছি, এ শুধুই সূর্যতপার গল্প। কিন্তু এ গল্প সমানভাবে তমসারও গল্প!তবু এ গল্পে আমিতো তিতলির এমন করুণ পরিণতি চাইনি, এ বয়সেই ওর এমন দুঃসহ একাকীত্বও চাইনি। চেয়েছিলাম… শুধু একটু লেখাপড়া শিখুক, মানুষ হোক। তবে……!

এমন সময় আমাকে আবারও অবাক করে দিয়ে একটা কাগজ আমার চোখের সামনে মেলে ধরল, তাতে জ্বলজ্বল করছে একটা কবিতা! তারপর আমাকে বলল- আমাকে এত কেন ভালোবেসেছো মাসিমণি যে তোমার সবটুকু আলো আমায় দিয়ে নিজেকে এমন অন্ধকারে ভরিয়ে দিয়েছো? এভাবে কি কেউ নিজের প্রতি অবিচার করে? আমি জানতাম একথা তাই এ কবিতা আমার একার নয়, তোমারও মাসিমণি। মূহুর্তে আমার দুচোখে জ্বলে উঠল সহস্র ভোরের আলো-----
এসো মাধবী রাত… এসো গৈরিক আশা
 এসো চৈতালী হাওয়া… হেমন্তী ভালোবাসা।
 এসো স্বপ্নসাম্পান… গেয়ে আনন্দগান
 এসো চাঁদের সরণী বেয়ে… সাগর সঙ্গমে নেয়ে।
 তোমারই প্রতীক্ষাতে আছি
 ফুলশয্যা রচিয়াছি
 নিজহাতে জ্বেলেছি চিরাগ,
তব চন্দনচর্চিত আননে… এঁকে দিতে চুম্বনদাগ।
 এসো প্রেম 
 এসো নিকষিত হেম
 তব শিঞ্জিত চরণে… অঞ্জলি দেবো অনুরাগ।
 এসো ভোরের বহ্নি হয়ে
 এ বিষাদ সাগর বলয়ে-
 ------হে বন্দিত ভৈরবী রাগ……।

স্বপ্ন এভাবেও সত্যি হয়! তমসার চারপাশে সূর্যের গাঢ় সোনালি রঙ! রচনা করেছে নতুন দিনের নতুন আলোর বৃত্ত! সেই বৃত্ত জুড়ে উড়ছে ঘুরছে অসংখ্য তিতলি!
সূর্যতপার চোখে চোখ রেখে আমি ক্রমশঃ তলিয়ে যেতে থাকলাম… অভিভূতের মত বললাম- কোথায় অন্ধকার রে! এই যে আমায় ঘিরে এমন স্বর্গীয় আলোর বিচ্ছুরণ………! 

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


মায়া




একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থামল ট্যাক্সিটা। ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ লেগে এসেছিল। কতদূর এলাম কে জানে? চোখ খুলতেই ড্রাইভারের সামনে রিয়ার ভিউ মিরর থেকে ঝোলানো পুতুলটার দিকে চোখে পড়ল। কাল থেকে এই নিয়ে তৃতীয় বার দেখলাম পুতুলটাকে। ছেঁড়া সাদা কাপড় পুঁটলি পাকিয়ে বানানো। পরনে ফ্লোরেসেন্ট সবুজ রঙের ফ্রক। সম্ভবত পুরোন শাড়ি কেটে তৈরি। অপটু হাতে আঁকা চোখ মুখ। দুই গালে লাল রঙের ছোপ। চমকে উঠলাম। ট্যাক্সিতে ওঠার সময় নজরে পড়েনি। দু-হাতে ভাল করে চোখ ঘষে আবার তাকালাম। চলমান আলো-ছায়ায় সদ্য চেনা কুরূপা পুতুলটা যেন দাঁত বার করে হাসছে।

সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে বেরোতে একটু দেরিই হয়েছিল। খালি ট্যাক্সিটা টি-বোর্ডের সামনে থেকে পেয়ে গিয়েছিলাম। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছিল। মনে হচ্ছিল আজ অফিস না এলেই হত। নেহাত বিদেশী ডেলিগেটদের সঙ্গে জরুরী মিটিং ছিল। তাই বাধ্য হয়ে। চোখ দুটো জ্বালা করছিল। গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি। রাত তিনটের সময় ফোনটা এসেছিল। অন্যদিকে একটা কর্কশ কন্ঠস্বর, “আপনাকে এখুনি একবার আসতে হবে।”
সেই থেকে জেগে। ভোরবেলা দিল্লী রোডে ট্রাকের নীচে থেকে দোমড়ানো মোচড়ানো হলুদ রঙের ট্যাক্সিটাকে টেনে বার করার সময় দ্বিতীয় বার দেখেছিলাম পুতুলটাকে। কালিঝুলি মেখে ধাতুর চাঙ্গড় থেকে ঝুলছিল। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একমাত্র পুতুলটার অবয়বই চেনা যাচ্ছিল। পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসারটি বলছিল, “ভাল করে দেখুন, এই ট্যাক্সিটাই তো?”

বললাম, “তাই তো মনে হচ্ছে।”

মায়ার রক্তাক্ত শরীরটা তখন ট্যাক্সির ভেতর থেকে বার করছিল ওরা। কানের দুল, গলার হার, অনামিকার আংটি দেখে সনাক্ত করলাম। ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির ভেতর আর একটি ক্ষত-বিক্ষত মৃত দেহ। কোনো যুবকের, পিছনের সীটে, মায়ার পাশে। পরিচয় জানার উপায় নেই। কে ছিল মায়ার সঙ্গে? মায়ার অফিসের কেউ? কোনো বন্ধু? জানি না। মাথা টলছিল। রাস্তার ওপরেই বসে পড়েছিলাম। অফিসারটির বোধহয় দয়া হল, চোখ কুঁচকে বলল, “এখন যান, পরে আবার কন্ট্যাক্ট করবো।”

ট্যাক্সিটা জ্যামে পড়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার চলতে শুরু করল। জানলা দিয়ে শীত হাওয়া আসছে। বাইরে তাকিয়ে মনে হল দক্ষিণেশ্বরের ব্রীজ পেরোচ্ছি। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় যাচ্ছেন? সাউথের দিকে নিতে বললাম যে আপনাকে।”

সে কোন জবাব দিল না।

আমি আর মায়া দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়েছিলাম। পায়ের কাছে জল ছলছল করছিল। মায়া জিজ্ঞেস করল, “আমাকে আকাশের মত ভালবাসতে পারবি?”

“কে আকাশ? তোর কোন পূর্ব প্রেমিক?”

“দূর বোকা! মাথার ওপর এতখানি খোলা নীল। জিজ্ঞেস করছিস কে আকাশ। এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়...।”

আমি ঘাড় গোঁজ করে বললাম, “আকাশে যে মেঘ জমে...।”

“জমুক মেঘ, তবু তার কত রঙ...।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “নাঃ, তবে চাস যদি আমি তোকে কালবৈশাখীর ঝড়ের মত ভালবাসতে পারি।”
 “সে তো মুহূর্তের। সব ওলোট পালোট করে দেয়।”

“ঠিক, দামাল ছেলের মত। জানলার কপাট টেনে বন্ধ করার আগেই ঘরে ঢুকে পড়ব। চুল এলোমেলো করে দেব। দুহাত দিয়ে শাড়ির আঁচল সামলে রাখতে পারবি না।”

মায়া লজ্জা পেল, “নাঃ আমার চাই না অমন দস্যি বৃত্তি।”

“আচ্ছা, তবে আমি তোকে বনবাসী শবরের মত ভালবাসব। বনের মধ্যে একটা পর্ণ কুটীর বানাব। আমি পাখি শিকার করে আনব আর তুই জঙ্গল থেকে গাছের ভাঙা ডাল কুড়িয়ে আনবি। পাখিগুলো আগুনে ঝলসে দিবি। দুজনের দিব্যি চলে যাবে।”

“তুই একটা বন্য বর্বর।”

তবু আমরা ঘর বেঁধেছিলাম। পর্ণ কুটীর নয়, দক্ষিণ কলকাতায় একটা দু-কামরার এপার্টমেন্ট নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এক ছাদের নীচে থাকতে থাকতে হয় তো কোনোদিন মায়া আকাশ খুঁজে পেয়ে যাবে। আর আমি বনাঞ্চল। খুঁজতে খুঁজতে বয়স বেড়ে যাছিল। আর পৃথিবীর সব আকাশ ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় কালো হয়ে যাচ্ছিল। সব বনাঞ্চল আড়াল করে কংক্রিটের মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং উঠছিল।

গত কাল রবিবার ছিল। মায়া আমাদের যৌথ এপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। জানতাম যাবে, সম্পর্কটা কিছুতেই দাঁড়াচ্ছিল না। যতটা স্পেস চাইছিল মায়া, দিতে পারছিলাম না। ঘরের মধ্যে কি আকাশ পেড়ে আনা যায়? মায়া কিছুতেই বুঝতে পারছিল না। জেদ করছিল। বড় স্যুটকেসটা হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে টেনে মায়া ট্যাক্সির ডিকিতে তোলার চেষ্টা করছিল। আমি হাত লাগালাম। মায়া বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”

বললাম, “সত্যিই চললি?”

যেন তখনও সন্দেহ ছিল। মায়া মুখ ঘুরিয়ে নিল। আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে গেল। আমি ট্যাক্সির জানলায় হাত রেখে ভিতরে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় যাচ্ছিস? কার সঙ্গে?”

মায়া উত্তর দিল না। ট্যাক্সিটা স্টার্ট দিল। আমি ড্রাইভারের দিকে ফিরে বললাম, “এক মিনিট, ভাই।”

দেখলাম রিয়ার ভিউ মিরর থেকে পুতুলটা দোল খাচ্ছে। তখনই প্রথমবার দেখেছিলাম পুতুলটাকে।
 আপাতত ট্যাক্সিটা ব্রীজ পার হয়ে নিরবিচ্ছিন্ন ছুটছে। হাতের ঘড়িতে চোখ নামিয়ে দেখলাম রাত প্রায় সাড়ে এগারো। এতক্ষণ চলেছি। ঘুমের মধ্যে বুঝতেই পারি নি। চোখ সরাতে গিয়ে থমকে গেলাম। ঘড়ির ডায়ালে দিন আর বার রবিতেই আটকে আছে। রবি বার? মানে গত কাল? ঘড়িটা চোখের কাছে এনে দেখলাম সেকেণ্ডের কাঁটাটা দিব্যি চলছে, যেমন চলে। আজ কত তারিখ? কী বার, রবি না সোম? জানাটা ভীষণ জরুরী। হঠাৎ সন্দেহ হল আজ ভোর থেকে যা যা ঘটেছে সেগুলো আদৌ সত্যি নাকি আমার কল্পনা? কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। ভয়ের হিম স্রোত নামছিল শিরদাঁড়া বেয়ে। কালকে ট্যাক্সিতে মায়ার সঙ্গে কে ছিল? আমার অসাড় হাতের ওপর কেউ ভিজে হাত রাখল। আবছায়ায় ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম মায়ার কমনীয় মুখ। রাগ করে নেই আর। একটু যেন ভয়ই পেয়েছে। আমাদের দুজনকে নিয়ে ট্যাক্সিটা দিল্লী রোডের দিকে ছুটছে। সময়ের অন্যদিক থেকে আসা ট্রাকের হেড লাইটের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। অবশ্যম্ভাবী গন্তব্যে পৌঁছনোর অপেক্ষায় আমরা পরস্পরের হাত জড়িয়ে বসে আছি। এখন থেকে ঠিক সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে, আমাদের খালি এপার্টমেন্টে টেলিফোনটা বেজে বেজে থেমে যাবে।

সহেলী রায়

                           বিবাহবার্ষিকী







“সময় আর অসময়ের মাঝে
 নীলচে আকাশ , আর নিচে
 ঝুলন্ত ব্রিজ আর আমি
 বন্দী ।
 দু'পা এগোলেই টোপা হাসির ঝর্ণা
 প্রশ্রয়ে প্রশ্ন করে কেমন আছ?
অসময়ের নিরালম্ব বেজে চলে ঘণ্টাধ্বনি
 পুরনো গির্জা থেকে ...
আমি কি একা ফিরে যাব?”

চারতলার ওপরে কটন মিলের কোয়ার্টার। সামনে গঙ্গা। এত হাওয়া জানলা খুলে রাখার উপায়ই নেই। ফাঁকা বোতল, ক্যালেন্ডার সব ওলটপালট।সন্ধেবেলা গঙ্গার পাড়ে ভালই লোকজনের যাতায়াত। মাধুরী জানলা বন্ধ করতে এসে খানিক্ষন দাঁড়াল। মৌলী পড়ছে আর ঢুলছে। অবশ্য মেয়েটার দোষ নেই, সেই ভোর চারটেয় দিন শুরু হয়েছে। শ্রীরামপুর থেকে কলকাতা, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের অপজিটে স্কুল।যাতায়াতেই অর্ধেক দিন বেড়িয়ে যায়। রাতে বেশীক্ষণ পড়তে পারে না বলে ভোরে টানে। মাধুরী জানলা বন্ধ করে টিভিটা চালাল। দূরদর্শনে এক প্রবীণা লাইনগুলো আবৃত্তি করছেন। কি সাবলীল ভঙ্গিমা , কোন বাঁধা ছাড়াই এগিয়ে চলেছে আপন গতিতে। “আমি কি একা ফিরে যাব?” মাধুরী কেমন ডুবে গেল এই প্রশ্নে। এতটাই অতলে হাতড়াতে লাগল যে পরের লাইনগুলো ঠিক মত শোনাই হল না। পাশের কোয়ার্টারের জানলা দিয়ে মেট্রো চ্যানেলের হিন্দী সমাচার শুরুর সুর ভেসে আসতেই সম্বিৎ ফিরল মাধুরীর। একটু বিরক্তও লাগল। পাশের বাড়ির পাল পরিবার সারাদিন হিন্দী চ্যানেলে মগ্ন। তবু ভাল, এখন টিভি এসেছে ও বাড়িতে। আগে তো সন্ধে হলেই গোটা পরিবারের এ বাড়িতে সমাগম ঘটত। একে মৌলির পড়াশোনার দফারফা তার ওপর অতিথিদের পছন্দের অনুষ্ঠান পরিবেশন, মাধুরী নাজেহাল হয়ে যেত। এদিকে সন্ধে হলে তো অনিমেষের টিকি পাওয়া দুষ্কর। ৮.৪০ এ হিন্দী সমাচার শুরু হলে মেয়েটাকে খেতে দিতে হবে। অনিমেষের বাড়ি ঢোকার নামগন্ধ নেই। আজ আবার কোথায় ঠেক কে জানে। প্রতিটা সন্ধেয় নেশায় ডুবতেই হবে। তিনটে মানুষ নিয়ে মাধুরীর গোছানো সংসার। অনিমেষের কটন মিলের চাকরিতে ভালই আয়। কোয়ার্টারের প্রতিটা ঘরেই লক্ষ্মীশ্রী ভাব। অবশ্য পুরো ক্রেডিটটাই মাধুরীর একার। অনিমেষ বাউন্ডুলেপনা নিয়েই ব্যস্ত। নিজের কাজ, বইপড়া, সমাজসেবা আর নেশা। টাকাপয়সা লোকজনকে সাহায্য করতেই খরচ করে ফেলে। কার সাইকেল, কার মেয়ের বিয়ে সব একা যেন অনিমেষেরই দায়িত্ব। উনি ভগবানের দূত। তার সাথে নেশার খরচ। বিয়ের কয়েক বছরে মাধুরী এসব বুঝেই সর্বস্ব মাইনেটুকু নিজের কাছেই রাখে। দরকার মত অনিমেষ চেয়ে নেয়। তাছাড়া এ লক্ষ্মীশ্রী সম্ভব নয়। মৌলীর জন্য একটা ভাল স্কুল আর সংসারে একটা স্বচ্ছলভাব, আর কি চাই?
- কি এমন সুস্বাদু জিনিস যে তুমি ছাড়তে পারছ না?
- আঃ, চীৎকার কোর না, মৌ জেগে যাবে
 জড়ানো গলায় অনিমেষ বলল। বাথরুমের সামনে টলতে টলতে পৌঁছেও প্যান্টের জিপ না খুলেই পেচ্ছাপ করে ফেলল। মাধুরী ঠেলে বাথরুমে ঢুকিয়ে অনিমেষের মাথায় জল ঢালতে লাগল।কাঁদতে কাঁদতে বলল,
- আজই মেয়ের মাথা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর, ছাইভস্ম ছাড়বে
- আমায় তাড়াতাড়ি ঘরে নিয়ে চল, আঃ ঘুম পাচ্ছে

মশারির নীচে অঘোরে মৌলী ঘুমচ্ছে। অনিমেষ প্রায় ভিজে গায়েই নিজের বিছানায় শুল। মাধুরী যতটা পারল মোছালো। তারপর সারারাত প্রায় জেগে মৌলীর পাশে। তার সাজানো সংসারে এক টুকরো মন্দ বাতাস। মাধুরী একা ফিরে যাবে? চোখ দুটো ভিজে আসে। শেষ কোথায় কে জানে।

দিন তিনেক আগের ঘটনা। তারপর দুদিন অনিমেষ বাড়িতেই ছিল, বলেছিল খেলে বাড়িতে বসেই খাবে। এটুকু মাধুরীকে আলাউ করতেই হবে। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল ভেবে মাধুরী নিমরাজি হয়েছিল যদিও জানত এ ব্যবস্থা বেশিদিনের নয়। এই সতের বছরের সংসারে এটুকু চেনা হয়ে গেছে অনিমেষকে। কিন্তু আজ কি হল? রাত বাড়ছে ক্রমশ। মেয়েটাকে খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছে। নিজেও রেগেমেগে খেয়ে ফেলল ভাত চাট্টি। কার জন্যে অপেক্ষা? আর লাভই বা কি? নেশার ঘোরে তো কিছুই মুখে তুলবে না। কোনদিন কিছু অঘটন না ঘটে। অজানা চিন্তায় মাধুরীর বুক কেঁপে উঠল। রাত সাড়ে বারোটা। অনিমেষ মোটামুটি পৌনে বারোটার মধ্যে ঢোকে। আজ একটু বেশিই রাত হচ্ছে। জানলাটা খুলে আবার দাঁড়াল মাধুরী। লোকজন আগের চেয়ে কম। ফেরিঘাট অন্ধকার। লাস্ট ফেরি তো ১১টাই। মোটর বোটগুলো সারিবদ্ধভাবে ঘাটে বাঁধা। কোন কোন নৌকায় কুপির বাতি জ্বলছে। মাঝিদের বিশ্রামের সময়। অনিমেষ ওপারে যায়নি তো? বারবার ঘরবার আর অস্থিরতায় ভোর হল।

- মৌ ওঠ, বাবা সারারাত বাড়ি ফেরেনি

ধড়মড় করে উঠে বসে মৌ হতবাক।

- নে চল, দেখি কোথায় পড়ে আছে নাকি সব শেষ, কে জানে?
হাওয়াই চটিটা পায়ে গলিয়ে মা মেয়ে ফেরিঘাটের দিকে এগোল।
- অ বাবু উটুন, আপনার পরিবার এয়েচে, মাঠাকরুন স্বামীকে সামলাও, এক গলা মদ খেয়ে গঙ্গা হেঁটে পার হচ্চে, নেহাত আমি
গঙ্গার পাড়ে কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা মানুষটা পড়ে আছে নিস্তেজ হয়ে। ভিজে শার্টপ্যান্টে, গঙ্গামাটি শুকিয়ে কাঠ। মাধুরীকে দেখেই মাঝি চেঁচিয়ে উঠল।
রিক্সায় উঠে আঁচলের খুটে চোখ মুছল মাধুরী
- এর চেয়ে বিধবা হলেই ভাল
- (জড়ানো গলায়) কাল আমাদের বিয়ের তারিখ ছিল, তাই তাড়াহুড়ো করতে গেলাম, আর...
প্রথম খেয়া ঘাট ছাড়ছে। মাধুরী কোলে মৌলী, আরেকটা হাত অনিমেষের হাতে। সেরা মুহুর্তের স্বাদ মাধুরীর মুখে চোখে। এভাবেও একসাথে ফেরা যায়।

অশোক মজুমদার


ইতরাদি




এখন দুপুর। শীতকালটা সম্বরণ প্রত্যেকদিন বাঁধান ঠাকুরের থানে বসে। ভাত খাবার পর রোদ পোহানোর দল আছে।নির্দল জটেবুড়ি কোন ঘেঁষে শুয়ে থাকে,সিঁড়ি অবধি রোদ পড়ে,ঠাকুরদালানে রাধাকৃষ্ণের সে রোদ জোটেনা।এ সময়ে পায়রারা চুপচাপ,প্রাণী বলতে জটেবুড়ির খুঁটে বাঁধা গরুটা;আর গোটাকত সিঁড়িতে ঠাই না পাওয়া কুন্ডুলি পাকা কুকুর ফালি রোদে ঘুমোচ্ছে।
 সম্বরণ, স্যাঙাত-পড়শি সমেত বসে বেশ বোঝাচ্ছিল।বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে অধীরখুড়োর ঝোলা পাঞ্জাবিটা দেখে চাপল,আর বিড়বিড় করল ‘ঐ আসছে!হুঃ!
অধীরখুড়ো এসেই খোঁচা দিল, ‘তা,ক’জন জোটালে হে সম্বরণ?’
জোটালে মানে কি হ্যাঁ? জোটালে মানে কি? এই যে নিত্য,শঙ্কর এদের জিজ্ঞেস করে দেখ দিকি,এদের কি আমি জোর করিচি কি!সফিকুল আর শঙ্করের সাথে বেচু ও ঘার নাড়ল ,না;তাদের জোর করেনি সম্বরণ।তারা সেধেসেধেই শুক্কুরবার বেগোপাড়ার চার্চে গেসলো।এবং সক্কলেই আরো বলল যে তারা কেউই পঞ্চাশ টাকা করে পায়নি।
 তবে? তবে গাঁয়ে যা রটেছে তা কি ফালতু? শুক্কুরবার,রবিবার চার্চে গিয়ে প্রার্থনা করলেইপঞ্চাশ করে দিচ্চে!
অধীরখুড়ো হুমম করে একটু রা কাড়ল,কিছুটা তিরিক্ষি চোখ বুলালো সে রোদপোহয়া দলে। নির্দলে জটে বুড়ি যেন আড় ভেঙে পাশ ফিরে হাতের উপর শু’ল।
‘-আর তাছাড়া দিলেই বা কি? কে দেয় পঞ্চাশ টাকা ,না খেতি পেলি?’
ব্যাস্! এই ভয়টাই পাচ্ছিল সম্বরণ।অধীরখুড়ো তেলেবেগুনে হলে বড্ড গায়ে ঝাল লাগা কটুকাটব্য করে।
-হেঃ,দেখলে তো ভায়া সম্বরণ,নিজে তো বাপঠাকুরদার দেওয়া নামটা র মান রাখলেনা।হুঃ, সম্বরণ! কখনো করেছ? তা নিজে তো করোইনি ,এখন এদেরও নাল ঝরাতে শেখাচ্ছ ! তা,বামুন পাড়া আগুন জ্বাললে...মসজিদ ভাঙলে ;ক’টা বামুনের মেয়ের ইজ্জত গেসল? বাপু,তোমার বাপ ঠাকুরদা শুনিচি মাজারের ও খেয়েচে আবার মন্দিরেরও।গাঁ শুদ্ধু বর্ষার ভয়ে সিঁটিয়ে আর তেনারা ত্রাণের মাল জড়ো করে তার ওপরে বসে গড়গড়া টানতে টানতে জীবন পার করেচে।যে-কটা বাঁচবে, বর্ষা শেষে তাদের চড়া দামে বেচবে সে মাল... এই তো?
সম্বরণ খড়গহস্ত, অধীর খুড়োর উপর প্রায় চড়াও হয়ে গাল পাড়ে তা শুনে।
-দেখো খুড়ো,বাপ তুলবেনা বলে দিচ্চি!বয়সে বড় বলে সম্মান করছি,নইলে এক এ কিল-এ তোমার দফারফা করে দিতুম শালা।
 দুপুরের নরম রোদের সাথে উত্তুরে হাওয়া কাঁপুনি ধরাচ্ছিলো। ভীষণ হইহই শুরু হ’ল ঠাকুরদালানে।গালমন্দে সে এক হুল্লোড় গাদাগাদি।
 খুড়ো বললে, দ্যাখনা, পঞ্চায়েতে যদি না কান ধরে ওঠবোস করাতে পারি তো আমার নাম পালটে নাম রাখবি,সুমুন্দিরা।বয়স গেরাজ্জি করোনা না ?
হঠাৎ কখন যে, সেই নির্দল জটেবুড়ি উঠে এসেছে তা কেউ লক্ষ্য করেনি।
 প্রথমে তার তেলো লাঠির খোঁচা আর খ্যাক্ করে ফেলা থুতু পড়ল বেচুর গায়ে। তারপর আরো যাকে যাকে নাগালে পেল সে থুঃ থুঃ করে কুকম্ম থুকে দিল ।‘এইই মাটি কইরেচে’ বলে যে যেদিকে পারছে তার নাগালের বাইরে পালাচ্ছে দেখে বুড়ি গাল পাড়তে লাগল।
 শাঁআআআলা,দুকুর বেলায় ঘুমুতে দেবেনা,বেরহ বের-হ এখান থেকে খচ্চরগুলান! হিঁদুর মেয়ে ছিনু; মোছলমানের ব্যাটা বে করে এই ভাগাড়ে ফেলেচে। শাআআআলা...একন আবার খেস্টান হতি হবে?এই পাঁচ টাকা দে বলে ছিপিএনে ভোট দে,এই গায়ের কাপড় দে বলে তিনোমুলে দিস খোন... একন আবার কোত্থে কে এয়েচে তিরিশুল নে গেরুয়া না জানি !বলে সে কাঁদতে বসল ‘কি-কি না হইনি ? কারে না ভোট দিইনি,ভাত চাইলি ছব ব্যাটা পেচন দেকিয়েচে’
জটে বুড়ি না ? জট পড়বে না তো কি ? এই চুল দেখে; কোন কোন জাত আসিসনি রা গাঁ শুদ্ধু ?
সন্ধ্যা হলিই ‘ভারতী’ ‘ভারতী’ বলে তামাক সাজাতে ? আর এই ব্যাটা অধীর ন্যাকা চৈতন ! বলি,জ্ঞান ঝেইড়ে ঝেইড়ে আর ক’দিন, আ্যঁ !
ভর বচ্ছর বাঁচি কি বাঁচিনে তা তো দেকিসনে, শুদু ভোটের ছময় ... “ভোট ট নষ্ট করিস নে বুড়ি” এবার বলতি আসিস তোর মুখে ঝ্যাঁটা মারব,দেকিসখোন ।

রুখসানা কাজল

                                      বিহু




বা দিকের জানালা দিয়ে ওবায়েদ সাহেবকে দেখছিল বিহু। দারুণ লাগে ওবায়েদ আঙ্কলকে। কাঁচাপাকা চুল কি অনির্দেশ্য মিষ্টি হাসি। দাঁতগুলো অসাম। টোটাল সেক্সি প্যাকেজ। বিহু ভাবতেই পারে না কারো দাঁত এত ক্রেজি করে তুলতে পারে অন্য কাউকে । ওবায়েদ আংকেলের ভয়েস শুনলেই ও তাই এই জানালার পাশে পর্দার আড়ালে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘিয়ে রঙের ফতুয়ায় নীল জিন্সের আংকেল মুখ তুলে গাছগুলো দেখছে। কেমন শিরশির করে উঠে ওর শরীর। ইচ্ছা করে ঘুঙুর বেঁধে ঝাঁপতালে অনেক্ষণ নাচতে। আর নাচ শেষে ঘামমাখা ক্লান্ত শরীর থেকে একে একে সব পোশাক খুলে দেওয়াল আয়নায় নিজের মুখোমুখি হয়ে ওবায়েদ আংকেলকে ভাবতে। কেমন কেঁপে কেঁপে উঠে শরীর। একেই বোধহয় বলে, আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায়, বাজায় বাঁশী----
পাকা উঠোনের পাশে মাটির আরেকটি উঠোন । সেখানে আম কলা নারকেল পেয়ারা সজনে পেঁপে জাম গাছ। ফল হয় কিন্তু পাড়া প্রতিবেশী কাউকে কোনদিন কিছু ছোঁয়ায় না ওবায়েদ আংকেল আন্টি । অনেকেই সমালোচনা করে আড়ালে, এই জন্যেই তো ওদের কোন সন্তান হয়নি । কি কিপ্টুস বাবারে বাবা!এটা শুনলে বিহুর খুব রাগ হয়। যেন কৃপণদের কখনো সন্তান হয় না! যাচ্ছেতাই মানুষজন। মা অবশ্য মাঝে মাঝেই বলে ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় এমন দৃশ্য বিরল। কিছু না দিক অন্তত চোখের আরাম তো পাচ্ছি।
 গাছগুলো একবার দেখে আংকেল গাড়িতে উঠে পড়ে। আজ তো ছুটির দিন। কানাঘুষায় এটুকু জানা যায় ছুটির দিনগুলোতে আংকল যাত্রাবাড়ি না কোথায় যেন চলে যায়। সেখানে অন্য একজন আন্টি থাকে। একটি ছেলেও নাকি আছে। দুদিন থেকে আবার পুরানো বাড়ির পুরানো আন্টির কাছে ফিরে আসে। পুরানো আন্টি এই নিয়ে কোন ঝামেলা করে না। ঝগড়া বা চেঁচামেচি কিচ্ছু করে না। মা একবার গাড়ির দরোজা খুলে গল্প করেছিল পুরানো আন্টির সাথে । আঙ্কলের বিরাট লাল গাড়ি বিহুদের ছোট্ট সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়িকে আটকে দিয়েছিল বাসার সামনের ব্লাইণ্ড গলিতে। কি যেন হয়েছিল লাল গাড়ির। আঙ্কল মিস্ত্রী আনতে গেলে মা আর পুরানো আন্টি গল্প শুরু করছিল দুনিয়ার আজেবাজে সব বিষয় নিয়ে।
 বিহুকে দেখে কেমন অবাক হয়ে গেছিল পুরানো আন্টি। বার বার দেখছিল। মা বলেছিল, ভাবি আমার মেয়ে । এবার ক্লাস নাইনে উঠল।” পুরানো আন্টির মুখ কালো বোরকায় ঢাকা। কেবল চোখ দেখা যায়। কথাও বলেন ফ্যাসফ্যাসে ভয়েসে । সেই ত । সেই ত! কত ছোট ছিল। ওকে টাওয়েলে জড়িয়ে এই পাড়ায় এসেছিলেন। বড় হয়ে গেছে আপনার মেয়ে বলে আবার বিহুকে খুঁটিয়ে দেখে। তাড়াতাড়ি সালাম দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে চলে এসেছিল বিহু। বদলে গেছে আন্টি। হাতে মোজা পায়ে মোজা । সিনেমার দস্যুরাণীর মত লাগছে। মা কি করে চেনে বক্কা জানে।
 সেদিন আন্টির সাথে কথা বলে ঘরে ফিরে মুখচোখ কাঁদো কাঁদো করে মা বলেছিল, বুঝলি তো সব পুরুষের এক স্বভাব। তোর ড্যাডাও বিয়ে করে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সুখে আছে নিশ্চয়।” ফ্রিজ থেকে ললি আইসক্রিম বের করে সবে কামড় দিচ্ছিল বিহু। রাগী চোখে তাকায় ও। মা ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল, লম্পটের লম্পট ।মাতাল, অশিক্ষিত। তুই তো তার মেয়ে ।তুই কি করে বুঝবি মানুষের মন ।বদমাশের বাচ্চা বদমাশ। আমার সব শেষ করে দিয়ে চলে গেছে। শয়তান শুয়োর একটা ।” মাকে শুনিয়ে শব্দ করে নিজের রুমের দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিল বিহু।
 সত্যি আনবিলিভিয়েল ক্যারেক্টার এই মহিলার। বড় খালামনি যে বলে তোর মা একটা শিক্ষিত বোকচোদ কথাটি মিথ্যে নয়। এখনো অই এক পুরুষ নিয়ে খাবি খাচ্ছে। ড্যাডা ছাড়া মা আর কোন পুরুষের সাথে প্রেম করতে পারেনি। বিয়ের আগেও না। পরেও না। প্রচুর প্রেমপ্রার্থী মার। এই বয়সেও হেভি মাল। স্টাইলিশ । ফার্স্টক্লাস ব্রেস্ট, ঠোঁট । তীব্র আকর্ষণ শরীরে। কিন্তু তাতে কি! বিহু বুঝে গেছে মার ফিজিক্যাল আর্জ খুব কম। বেচারী! মাকাল নারী। সব প্রেম ভালবাসা আস্থা টাকা পয়সা ড্যাডাকে দিয়ে থুয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। কেউ শরীরের কথা বলে এগুলেই মা তাকে ব্লক মেরে দেয় । বুঝতে চায় না প্রেমের মাস্টার কী হচ্ছে শরীর । প্রেমিক তো শরীর চাইবেই। শরীর আছে তো প্রেম আছে । প্রেম মানেই প্রেমিক !
বিহু বুঝেছিল মা এখন দুদিন গুম মেরে থাকবে। কথায় কথায় বিহুর সাথে ঝগড়া করবে। আর অই বদমাশ লোকটির সাথে বিহুর নানা সাদৃশ্য বের করে চেঁচামেচি করবে। অথচ ড্যাডা চলে যাওয়ার পর ওদের চুক্তি হয়েছিল অই লোকটির কথা কেউ কখনো উচ্চারণ করবে না। আইসক্রিমের লাঠিটা চুষতে চুষতে বিহু হিসেব করে , বড়রা বিশেষ করে বাবা মার মত বড়রা অসম্ভব ফাউল । যখন তখন প্রমিজ করে যখন তখন প্রমিজ ভাঙ্গা ভাতমাছ এদের কাছে। তখন দুনিয়ার সব আর্গুমেন্ট, কজ, এনভার্মেন্ট, এবিলিটির কোয়েশ্চেন টেনে আনে । এই যেমন সাদাত আংকেলের বেলায় হল।
 ড্যাডা সত্যি মাকে ঠকিয়েছে । চলে যাওয়ার আগে চাকরিও ছেড়ে দিয়েছিল । একটু একটু করে সরিয়ে নিচ্ছিল আলমিরাতে রাখা লাখ লাখ টাকা। ব্যাংকে রাখলে এতদিন ধরা খেয়ে যেত কোম্পানির কাছে। বিহুর মনে আছে যাওয়ার আগের রাতে একটি বাজারের ব্যাগে অনেকগুলো খালি মদের বোতল মেইন রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলতে গেছিল ড্যাডা। সেই সুযোগে গোপন চাবি দিয়ে আলমিরা খুলে বিহু দেখে টাকার বান্ডিলগুলো নাই। তবে বিএফ এর ভিডিওগুলো আছে। এখান থেকে দু একটা সরিয়ে বিহু ওর বন্ধুদের নিয়ে ইশকুলে দেখে আবার রেখে দেয় । মা এগুলো জানেও না।ড্যাডাও বুঝতে পারে না। একটি ভিডিও নিয়ে দ্রুত আলমিরা লক করে বিহু পড়তে বসে গেছিল।
 পরিকল্পনা করেই চলে গেছে ড্যাডা। মার টাকা হাতিয়ে ফ্ল্যাট, জমি গোপনে নিজের নামে করে নিয়েছিল। জানতে পেরে মা চেপে ধরতেই নির্লজ্জের মত বলেছিল, আরে নমিনি তো তুমিই। আর কে আছে আমার তুমি আর বিহু ছাড়া। ফালতু চেঁচামেচি কর না ত।” মা কিন্তু ততদিনে বুঝে গেছে ভুল করেছে । লোকটা বদলে গেছে । অসম্ভব স্বার্থপর হয়ে উঠেছে । নিজের ছাড়া অন্যের কোন কিছু বোঝে না। মদ টদ খাওয়া মেয়েমানুষ নিয়ে ঘোরাকে মা অত পাত্তা দেয়নি। সৎ হিসেবে আগে কোম্পানিতে ড্যাডার প্রচুর সুনাম ছিল। কিন্তু অফিসেও ইদানীং টাকা পয়সা ঘুষ নিচ্ছিল। দু তিনবার কোম্পানির চেয়ারম্যান সতর্ক করেছে। ফোনের কথাবার্তায় মা বুঝে গেছিল যে কোন সময় হ্যান্ডকাপ পরতে পারে । এখানেই মার লেগেছিল। মার কাছে সন্মান অনেক বড় । না খেয়ে থাকতে রাজী মা কিন্তু সন্মান হারাতে মোটেই রাজী ছিল না। মা যুক্তি দিয়েছিল, আমাদের তো সব আছে, জমি, ফ্ল্যাট, নগদ টাকা, চাকরী তাহলে কেন অসৎ হলে? ড্যাডা তখন মরিয়া। মার মুখের সামনে মদের গ্লাস দুলিয়ে বলেছিল, আমার ইচ্ছা। মা শক্ত মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, মনে রেখো আমাদেরও কিন্তু ইচ্ছা আছে। ড্যাডা মার এই গলাকে ভীষণ ভয় পেত। কেমন ধাতব দৈব বাণীর মত কাট পালিশ ভয়েস। ইনফ্যাক্ট বিহুও ভয় খায় তবে সব সময় নয়!
বিহু বোঝে ড্যাডা মার কাছে সন্মান হারিয়ে এখানে আর থাকতে পারছিল না। তাছাড়া ড্যাডা টাকা দিয়ে আরো অনেক ইচ্ছা পূরণ করতে ক্রেজি হয়ে গেছিল। রোজ ঘরে ফিরে দুতিন বান্ডিল টাকা আলমারীর লকারে ঢুকিয়ে বসে পড়ত বোতল গ্লাস নিয়ে। বিহুর সাথেও কথা বলত না। বিহুর কি লাগবে, পড়াশুনা কি করছে কাদের সাথে মিশছে কিছু জানতে চাইত না। চলে যাওয়ার আগে একবার আহলাদ করে ড্যাডাকে ব্যাগ কেনার কথা বলতে গেছিল বিহু । প্রায় মারতে এসেছিল ড্যাডা । ঠিক সময়ে মা ড্যাডার হাত ধরে ফেলে আবার সেই গলায় বলেছিল, বিহু তোমার রুমে যাও। তারপর ডোর লক করে সে কি তুমুল ঝগড়া। ছিটকে আসা কিছু কথা শুনে অবাক হয়ে গেছিল বিহু। ড্যাডা মাকে সাবধান করছে, কিপ অয়ে ইওর ডটার আদারওয়াইজ আই রেপড হার মে এট এনি টাইম। মা ছি ছি করে বলেছিল, ইউ আর জাস্ট আ বিন । আই সোয়াপ ইউ।থু থু-- গেট আউট ফ্রম আওয়ার লাইফ।
 সেদিন থেকেই মার সাদাসিধে চেহারা শক্ত হয়ে উঠছিল। সংসারের কাজ করতে করতে বিহুকেও জুড়ে নিচ্ছিল সাথে । বিহু মার সাথে কাজ করতে করতে অবাক হচ্ছিল। ড্যাডা এত বদলে গেছে ? এরপর আর কোনদিন মা ঝগড়া করেনি । ড্যাডা চলে গেলে বন্ধুর মত হয়ে গেছিল মা মেয়ে। তবে প্রচুর রেজাল্ট খারাপ করছিল বিহু। মা শুধু বলেছিল, ক্লাস নাইন মানে তোমার জীবন তোমার বিহু । চেষ্টা কর। আমাদের মত নষ্ট মানুষদের জন্যে নিজের জীবন নষ্ট কর না । কিন্তু কিছুতেই বিহু পড়াশুনায় মন বসাতে পারছিল না। সেই সময়ে সাদাত আংকেল এসেছিল বাসায়।
 মার ছোটবেলার বন্ধু । প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক। একেবারেই হঠাত। মা নিজেই অবাক হয়ে গেছিল। আর কি আশ্চর্য সাদাত আংকেল সব জেনে কেমন সহজভাবে সংসারের একজন হয়ে গেছিল। মা ঘোর আপত্তি করলেও বিহু চাইত সাদাত আংকেল আসুক। উনি এলেই ঘর ভরে যেত। দূর শহর থেকে মাসে একবার আসত। আর বিহুর এটাসেটার লিস্ট বেড়ে যেত । প্রথম দিকে মা কেমন আড়ষ্ট হয়ে থাকত । আস্তে আস্তে মার মুখ নরম হতে দেখেছিল বিহু। প্রেম না হোক নির্ভরতা পেয়েছিল মা। দুজনে স্মৃতি ঘেঁটে গল্প করত । হাসত। এবং আরো কাছাকাছি চলে এসেছিল ।

 বিহুর খারাপ লাগেনি। মাকে সাদাত আংকেলের সাথেই মানায় ভাল । মাঝে মাঝে হঠাত ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে দেখত সাদাত আংকেল এসেছে। ওকে দেখে মার মুখে রক্ত খেলে যেত। কিছু না বোঝার ভান করে সহজ হয়ে গল্প করতে করতে ও খুঁজে দেখত মার শরীরে কথা ফোঁটার রুমঝুম। মা কি এখন প্রেম বোঝে ? বোঝে জীবনে কেবল একবার নয় বার বার প্রেম আসে । আসতেই পারে!